বুধবার
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষের বিবেক কি ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যাচ্ছে?

গোলাম ফারুক মজনু
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১০ পিএম আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
expand
মানুষের বিবেক কি ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যাচ্ছে?

কিছু কিছু অপরাধের ভয়াবহতা এতটাই গভীর যে সেগুলো শুধু একটি পরিবারের শোকের বিষয় হয়ে থাকার কথা নয়। একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ এবং মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই যথেষ্ট। মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং তাঁর এক বছর বয়সী শিশুকে নদীতে ফেলে হত্যার অভিযোগ তেমনই একটি ঘটনা।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১৯ আগস্ট ওই নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর শিশুসন্তানের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পাঁচ দিন পর, ২৪ আগস্ট, আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি এখনো তদন্ত ও বিচারাধীন। তাই অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়, অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত। কিন্তু তদন্তের চূড়ান্ত ফল যা-ই হোক, এমন অভিযোগের ভয়াবহতা আমাদের সামনে একটি গভীর সামাজিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, আমরা কোন ধরনের সমাজে বসবাস করছি, যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে?

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এমন একটি ঘটনা আমাদের সমাজে যতটা আলোড়ন সৃষ্টি করার কথা ছিল, অনেক সময় ততটা দীর্ঘস্থায়ী আলোড়ন সৃষ্টি করে না। এর একটি কারণ হতে পারে- আমরা প্রতিদিন এত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, শিশু নিপীড়ন ও নৃশংসতার খবর দেখছি যে ভয়াবহ ঘটনাও ধীরে ধীরে আমাদের কাছে পরিচিত সংবাদে পরিণত হচ্ছে। সকালে একটি নির্মম হত্যার খবর, দুপুরে যৌন সহিংসতার খবর, রাতে আরেকটি শিশুর ওপর নির্যাতনের খবর, এভাবে সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম স্রোতে মানুষের অনুভূতি যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ আমরা ক্ষুব্ধ হই, প্রতিবাদ করি, শাস্তি দাবি করি। তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনোটিকে সরিয়ে দেয়। এখানেই বিপদ সবচেয়ে বেশি। কারণ কোনো সমাজের জন্য শুধু অপরাধ বেড়ে যাওয়া বিপজ্জনক নয়, অপরাধের ভয়াবহতার প্রতিও মানুষের সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলা আরও ভয়ংকর।

মানুষ এমন নিষ্ঠুর আচরণে কীভাবে পৌঁছে যায়, এর কোনো একক উত্তর নেই। অপরাধী মানসিকতা সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। ব্যক্তির চরিত্র, পারিবারিক পরিবেশ, শৈশবের অভিজ্ঞতা, সামাজিক মূল্যবোধ, মাদক, অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, রাগ ও হতাশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, আইন সম্পর্কে ধারণা এবং বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা, সবকিছু মিলেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কোথাও আবার মানসিক সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই একটি ভয়াবহ অপরাধ ঘটলেই শুধু একটি কারণ ধরে সেটিকে পুরো ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। বরং আমাদের দেখতে হবে, একজন মানুষ অপরাধের দিকে যাওয়ার আগে তার চারপাশে কতগুলো সতর্কসংকেত তৈরি হয়েছিল এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সেগুলো শনাক্ত করতে পেরেছিল কি না।

এই জায়গায় নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার ঘাটতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সন্তানদের আমরা পরীক্ষায় ভালো ফল করতে শেখাই, ভালো পেশা বেছে নিতে শেখাই, অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে শেখাই। কিন্তু একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা সবসময় সমান গুরুত্ব পায় না। একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় সে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে, ক্ষমতা হাতে পেলে কী করে, প্রত্যাখ্যানের পর তার আচরণ কেমন হয় এবং নিজের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এসবের মাধ্যমে। একটি ছেলে যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে যে পুরুষের রাগকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, মেয়েদের নিয়ে অশালীন মন্তব্যকে হাসির বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয় কিংবা জোর করে কিছু আদায় করাকে পৌরুষ মনে করা হয়, তাহলে তার মানসিক গঠনে ভুল ধারণা জমতে পারে। তাই নৈতিক শিক্ষা কোনো পরীক্ষার অধ্যায় নয়; এটি পরিবারে প্রতিদিনের আচরণ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং সমাজের সামগ্রিক সংস্কৃতির অংশ হওয়া দরকার।

মাদকের বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মাদক অপরাধের একমাত্র কারণ নয়, এবং মাদক গ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি সহিংস অপরাধী হয়ে যায়, এমন ধারণাও ভুল। কিন্তু মাদকাসক্তি যখন অপরাধী পরিবেশ, সহিংস জীবনযাপন, অপরাধী চক্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে মাদকবিরোধী নীতি শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মাদকের সরবরাহকারী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সুস্থ সামাজিক সম্পৃক্ততার সুযোগও বাড়াতে হবে, যাতে অপরাধী পরিবেশ তাদের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।

আরেকটি গভীর সামাজিক সমস্যা হলো নারীর প্রতি অধিকারবোধ ও বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা। একজন নারী কোনো পুরুষের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন কি না, বিয়ে করলেন কি না, বিয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন কি না, কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেন কি না, এসব কোনো অবস্থাতেই একজন পুরুষকে তার ওপর জোর প্রয়োগের অধিকার দেয় না। বিশেষ করে ‘প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে না করা’ বা ‘বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা’কে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন বা শারীরিক অপরাধের কারণ হিসেবে দেখানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোনো নারী বিয়ে করবেন কি না, কখন করবেন, কাকে করবেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। একইভাবে কোনো পুরুষ প্রত্যাখ্যাত হলে তার দায়িত্ব সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা। প্রত্যাখ্যান অপমান নয়, এবং ভালোবাসা কখনো জোর করে অর্জন করার বিষয় নয়।

এখানে পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সমাজের প্রচলিত কিছু ভুল ধারণাকেও প্রশ্ন করতে হবে। আকাঙ্ক্ষা থাকা মানুষের স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে, কিন্তু নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বও মানুষেরই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার ইচ্ছা, রাগ, হতাশা কিংবা প্রত্যাখ্যান, সবকিছু সামলে কীভাবে আচরণ করবেন, সেটিই তার চরিত্রের পরীক্ষা। কোনো নারী ‘না’ বললে সেই ‘না’ মেনে নেওয়া, সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রতিশোধ না নেওয়া, কাউকে হুমকি না দেওয়া এবং কারও ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম না করা, এসবই সভ্য আচরণের মৌলিক শর্ত। ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই বোঝাতে হবে যে কাউকে পছন্দ করার অধিকার আছে, কিন্তু কাউকে পাওয়ার অধিকার নেই।

অপরাধ দমনে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধী যদি মনে করে তার অর্থ, ক্ষমতা, পরিচিতি বা সামাজিক প্রভাব তাকে রক্ষা করতে পারে, তাহলে আইনের ভয় দুর্বল হয়ে যায়। তাই শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; সেই আইন বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ও পেশাদার তদন্ত, প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষীর নিরাপত্তা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার বলতে তাড়াহুড়ো করে কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা বোঝায় যেখানে তদন্ত ও বিচার অযথা বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে না। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে অভিযুক্ত হিসেবেই থাকবেন এবং নির্দোষ ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

অপরাধ প্রতিরোধে পরিবারকেও নতুন করে নিজের দায়িত্ব বুঝতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কী পড়ে বা কত নম্বর পায়, এসব জানার পাশাপাশি তার মানসিক পরিবর্তন, বন্ধুত্ব, আচরণ, রাগ, হতাশা এবং অনলাইন কর্মকাণ্ডের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। একটি সন্তান যদি ক্রমাগত নারীবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করে, সহিংসতাকে উপভোগ করে, অন্যকে ভয় দেখিয়ে আনন্দ পায় কিংবা প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে না পারে, তাহলে সেটিকে ‘ছেলেদের স্বভাব’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে সে সমস্যায় পড়লে ভয় না পেয়ে পরিবারের কাছে কথা বলতে পারে। সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে তাকে বোঝা অনেক বেশি কার্যকর।

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ইন্টারনেটে সহিংসতা, নারীবিদ্বেষ ও যৌনতার বিকৃত উপস্থাপন পাওয়া যায়। একজন তরুণ যদি বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, সম্মতি, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা না পায়, তাহলে এসব কনটেন্ট থেকে সম্পর্ক সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে কোনো একটি ভিডিও, ওয়েবসাইট বা কনটেন্টকে সরাসরি অপরাধের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। অপরাধ সাধারণত বহু কারণের সম্মিলিত ফল। তাই প্রয়োজন বয়সোপযোগী শিক্ষা, ডিজিটাল সচেতনতা, অভিভাবকের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং তরুণদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ।

তবে এসব কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি মৌলিক সত্য যেন কখনো আড়াল না হয়, ভুক্তভোগী অপরাধের জন্য দায়ী নন। একজন নারী বিয়ে করেননি, কারও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, কোথায় গিয়েছিলেন, কী পোশাক পরেছিলেন, কার সঙ্গে কথা বলেছেন, এসব কোনো কিছুই তার বিরুদ্ধে সহিংসতার নৈতিক বা আইনি যুক্তি হতে পারে না। একইভাবে কোনো শিশুকে ঘিরে তার পরিবারের সিদ্ধান্তকে সামনে এনে শিশুটির ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় পরিবারের ওপর চাপানোও অন্যায়। অপরাধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ব্যক্তি, অপরাধের দায়ও তারই। ভুক্তভোগীকে দোষী করার সংস্কৃতি শুধু অন্যায় নয়; এটি ভবিষ্যতের ভুক্তভোগীদের সাহায্য চাইতেও নিরুৎসাহিত করতে পারে।

প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা হতে পারে শৈশবের শিক্ষা। ছেলেমেয়েদের বয়স অনুযায়ী শেখাতে হবে ব্যক্তিগত সীমারেখা, সম্মতি, সম্মান, নিরাপদ আচরণ এবং অন্যের স্বাধীনতার মূল্য। একটি ছেলে যেন বুঝতে শেখে যে বন্ধুত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা স্বাভাবিক, সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া জীবনের অংশ, রাগের কারণে কাউকে আঘাত করার অধিকার নেই এবং কারও ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা অপরাধ। একই সঙ্গে মেয়েদের নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তবে নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু মেয়েদের কাঁধে চাপিয়ে দিলে চলবে না। সমাজের পুরুষদেরও নিজেদের আচরণ, ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে তাকাতে হবে।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় পর্যায়েও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। নির্জন এলাকা, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা, নদীর ঘাট কিংবা যেসব স্থানে অপরাধের ঝুঁকি বেশি, সেসব জায়গায় নজরদারি ও দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো নারী বা শিশু বিপদের কথা জানালে তাকে সন্দেহের চোখে না দেখে দ্রুত নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং মানসিক সহায়তার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অপরাধের পর শুধু মামলা করলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না; ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও পুনরুদ্ধারের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।

এর পাশাপাশি পুরুষদের নিজেদের মধ্যেও পরিবর্তনের সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। বন্ধুরা যখন নারীর প্রতি অশালীন মন্তব্য করে, প্রত্যাখ্যাত নারীকে নিয়ে প্রতিশোধের কথা বলে কিংবা সহিংস আচরণকে সাহসিকতা হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন অন্য পুরুষদের নীরব দর্শক হয়ে থাকা উচিত নয়। একজন বন্ধু আরেকজন বন্ধুকে অপরাধের দিকে যেতে বাধা দিতে পারে। একটি পরিবার মাদকাসক্ত সদস্যকে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগ্রাসী আচরণকে ‘স্বাভাবিক ছেলেমানুষি’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। সমাজে অপরাধ ঘটার পর শুধু অপরাধীকে খোঁজা নয়, অপরাধের দিকে নিয়ে যাওয়া পথগুলোও বন্ধ করতে হবে।

সবশেষে যে বিষয়টি আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে, তা হলো নৃশংসতার স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। যখন প্রতিদিন নতুন একটি ভয়াবহ ঘটনা আমাদের সামনে আসে, তখন আগের ঘটনাটি দ্রুত মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি খবর পুরোনো হয়ে গেলেও ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে সেই ঘটনা কখনো পুরোনো হয় না। একটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের সারাজীবনের শোক; একজন নারীর হত্যাকাণ্ড একটি পরিবারের জীবনে স্থায়ী ক্ষত। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে থেমে গেলে চলবে না। সেই ক্ষোভকে আইনের দাবি, সামাজিক দায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত করতে হবে।

একটি দেশের সভ্যতার মাপকাঠি শুধু অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বড় শহর কিংবা অবকাঠামো নয়। প্রকৃত সভ্যতার পরীক্ষা হয় তখন, যখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে। একটি শিশু নিরাপদ কি না, একজন নারী নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না, নির্যাতনের শিকার মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না এবং ক্ষমতাবান অপরাধীও আইনের কাছে জবাবদিহি করছে কি না, এসবই একটি সমাজের মানবিকতার প্রকৃত মানদণ্ড।

তাই আমাদের লক্ষ্য শুধু অপরাধীর শাস্তি হওয়া নয়। এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করাও, যেখানে অপরাধী মানসিকতা গড়ে ওঠার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়। পরিবারে মূল্যবোধ, শিক্ষায় মানবিকতা, সমাজে দায়িত্ববোধ, মাদকবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা, ডিজিটাল সচেতনতা, নারীর প্রতি সম্মান এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সবগুলোকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কোনো নারী বিয়ে করেছেন কি না, কারও প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন কি না কিংবা নিজের জীবন কীভাবে পরিচালনা করছেন, এসব কখনোই তার বিরুদ্ধে অপরাধের দায় তৈরি করে না। অপরাধের দায় অপরাধীরই।

আমরা হয়তো একদিনে সব অপরাধ বন্ধ করতে পারব না। কিন্তু আমরা এমন একটি সমাজের দিকে এগোতে পারি যেখানে বিপদে পড়া মানুষকে দেখে কেউ মুখ ফিরিয়ে নেবে না, কোনো অপরাধী নিজের ক্ষমতাকে আইনের চেয়ে বড় মনে করবে না এবং কোনো ভুক্তভোগী নিজের ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধের জন্য নিজেকেই দায়ী মনে করবেন না।

একটি শিশুর নদীতে ভেসে ওঠা নিথর দেহ যেন কেবল এক দিনের সংবাদ হয়ে না থাকে। সেটি যেন আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন হয়ে থাকে, আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই?

যে সমাজে মানুষ শুধু বেঁচে থাকবে, নাকি যে সমাজে মানুষ নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং মানবিক পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকারও পাবে, সিদ্ধান্তটি আমাদেরই।

মো. গোলাম ফারুক মজনু লেখক ও গবেষক, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বিপ্লবী জনতা। সভাপতি, সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ (এসএসপি)।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন