


মানবতা- শব্দটি ছোট, কিন্তু এর অর্থ অনেক গভীর। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা, মমতা, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং অন্যের কষ্টকে নিজের মতো করে অনুভব করার নামই মানবতা। আমরা মানুষ হিসেবে জন্ম নিই, কিন্তু সত্যিকারের মানবিক হয়ে উঠতে হলে আমাদের বিবেক, মূল্যবোধ ও হৃদয়ের দরজা খুলে দিতে হয়। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- মানবতা কখনো কখনো হিংসা, স্বার্থপরতা, লোভ, অহংকার ও নিষ্ঠুরতার কাছে হার মেনে যায়।
আজ আমরা প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছি। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা মানুষের দুঃখ-কষ্টের ছবি দেখি, সহানুভূতির মন্তব্য করি, প্রতিবাদের পোস্ট দিই। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই ভার্চুয়াল সহমর্মিতা কি বাস্তব জীবনে আমাদের মানবিক করে তুলছে?
অনেক সময় দেখা যায়, বিপদে পড়া একজন মানুষকে সাহায্য করার বদলে তার ছবি বা ভিডিও ধারণ করতেই আমরা বেশি ব্যস্ত। কেউ রাস্তায় পড়ে আছে, কেউ নির্যাতনের শিকার, কেউ ক্ষুধার্ত- আর চারপাশের মানুষ তাকিয়ে দেখছে। এমন দৃশ্য আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে।
মানবতা হারানোর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকাশ দেখা যায় যখন মানুষের জীবনের চেয়ে স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। অর্থের জন্য প্রতারণা, ক্ষমতার জন্য অন্যায়, প্রতিহিংসার কারণে নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দেওয়া- এসবই মানবতার পরাজয়ের চিত্র। যখন একজন মানুষ অন্যের কান্না শুনেও নীরব থাকে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন শুধু একজন ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের মানবিকতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তবে মানবতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ রক্ত দিয়ে একজন অচেনা মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছেন, কেউ দরিদ্র শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিচ্ছেন, কেউ দুর্যোগের সময় নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে অন্যকে উদ্ধার করছেন।
কেউ হয়তো সামর্থ্য অনুযায়ী একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে একবেলা খাবার দিচ্ছেন। এসব ছোট ছোট কাজই প্রমাণ করে- মানবতা এখনো বেঁচে আছে।
মানবতা দিবস আমাদের সেই সত্যটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। এই দিনটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেওয়ার দিন নয়, বরং নিজের ভেতরের মানুষটিকে প্রশ্ন করার দিন।
আমি কি কারও কষ্টে পাশে দাঁড়াই? আমি কি দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল? অন্যায় দেখলে কি প্রতিবাদ করি? আমার সামান্য সাহায্য যদি কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে আমি কি সেই সাহায্যের হাত বাড়াই?
মানবতা চর্চার জন্য সবসময় বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। একজন বৃদ্ধকে রাস্তা পার করে দেওয়া, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, হতাশ একজন মানুষকে সাহস দেওয়া, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া কিংবা বিপদে পড়া কাউকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেওয়া- এসবই মানবতার উদাহরণ।
অনেক সময় একটি আন্তরিক কথা একজন ভেঙে পড়া মানুষকে নতুন করে বাঁচার সাহস দিতে পারে। এমন অসংখ্য মানবিক কাজ করে হয়েছি সমালোচিত আবার প্রশংসনীয় হয়েছি। তবে কখনোই প্রশংসা পেতে কাজ করিনি।
আমাদের সমাজে মানবতা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা কোনো সংগঠনের নয়; প্রত্যেক মানুষের। পরিবার থেকে শিশুকে শেখাতে হবে- অন্যের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, মূল্যবোধের শিক্ষাও দিতে হবে। সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে ভালো কাজকে উৎসাহ দেওয়া হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে সাহস হিসেবে দেখা হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, মানবতা কোনো ধর্ম, জাতি, শ্রেণি বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ অসহায় হলে তার পরিচয় নয়, তার প্রয়োজনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী তখনই সুন্দর হবে, যখন আমরা ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’-তে ফিরে আসব।
হয়তো সত্যিই মানবতা কখনো কখনো হার মানে। কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। একজন মানুষ যদি আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, একটি হৃদয় যদি অন্য একটি হৃদয়ের কান্না অনুভব করে, তাহলেই মানবতা আবার জেগে ওঠে।
মানবিক কাজ যখন 'আমরা' থেকে ' আমি' হয়ে যায় তখনই আমিত্ত ভাব হয়ে যায়। যখন আমিত্ত শুরু হয় তখনই মানবতা হারিয়ে যায়, আবার কখনো কখনো 'আমরা'র মধ্যে যখন ক্ষমতা আর স্বার্থ থাকে তখন মানবতা হারিয়ে যায়, মানবতার ফেরিওয়ালাদের মুল্যায়নও হয় না। তখন প্রাধান্য পায় ক্ষমতা আর স্বার্থ!
তবে একটা কথা উল্লেখ্য, মানুষ যখন ক্ষমতার শীর্ষে ওঠে, তখন অনেক সময় সে ভুলে যায়- তার চারপাশের মানুষগুলোও মানুষ। আর যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ বিবেকের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন মানবতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। ক্ষমতা ও স্বার্থের কাছে মানবতার পরাজয় নতুন কোনো ঘটনা নয়, ইতিহাসের পাতায় এর অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। তবে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আজও আমরা প্রতিদিন এর নতুন নতুন চিত্র দেখতে পাই।
ক্ষমতা মানুষের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই ক্ষমতা যখন মানুষের সেবা করার পরিবর্তে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ, দমন কিংবা নিজের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন মানবতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি দুর্বল মানুষের কান্না শুনতে না পান, অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে না দাঁড়ান, কিংবা নিজের অবস্থান রক্ষার জন্য সত্যকে চাপা দেন- তাহলে সেই ক্ষমতার কোনো মহত্ত্ব থাকে না।
অন্যদিকে স্বার্থ মানুষকে এমন এক অদৃশ্য দেয়ালের মধ্যে আটকে ফেলে, যেখানে অন্যের কষ্ট আর নিজের লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে কিছুই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। প্রয়োজনের সময় বন্ধুত্ব, সম্পর্ক কিংবা বিবেক- সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করার প্রবণতা সমাজে দিন দিন বাড়ছে। কেউ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ানোর বদলে অনেকে ভাবেন, “এতে আমার কী লাভ?” এই প্রশ্নটিই মানবতার সবচেয়ে বড় সংকটের প্রতীক।
তবুও মানবতা পুরোপুরি পরাজিত হয়নি। এখনও এমন মানুষ আছেন, যারা ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেন না, স্বার্থের জন্য বিবেক বিক্রি করেন না। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, অসহায়ের পাশে দাঁড়ান এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করেন। আড়ালে থেকেও অনেক মানবিক মানুষ মানবতার কাজ করে থাকেন। এমন তাদের কারণেই