বৃহস্পতিবার
২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশনত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে বিবৃতি কেন অরগানাইজ করলাম, এটাই ছিল অপরাধ 

সৈয়দ আফদাল আহমদ
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
সৈয়দ আফদাল আহমদ
expand
সৈয়দ আফদাল আহমদ

লে. জেনারেল (অব.) মামুন খালেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই মামুন খালেদ ব্রিগেডিয়ার হিসেবে ১/১১-র সময় ডিজিএফআইয়ের মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে লে. কর্ণেল গোলাম মাওলাকে দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করেছিলেন, চৈত্রের তীব্র গরমের মধ্যে একটি আলো বাতাসহীন দমবন্ধ হওয়ার মতো ঘরে বন্দী করে রেখেছিলেন।

আমার অপরাধ ছিল দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে গণমাধ্যমে ৭০০ সাংবাদিকের বিবৃতির উদ্যোগ কেন আমি নিয়েছিলাম?

সে কথা সংক্ষেপে তুলে ধরছি : ১/১১-র সেনা সমর্থিত জরুরী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। মিছিল মিটিং লেখালেখি সবকিছুর ওপর জরুরি আইনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কারাবরণ মেনে নিতে পারছিলাম না। কি করা যায়? আমি একজন সাংবাদিক শুধু লিখে প্রতিবাদ করতে পারি। সেটা যতটুকু পারি করছি। কিন্তু কোনো কাজে আসছে না। মাথায় এলো ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে সাংবাদিকদের স্বাক্ষর অভিযান সংবলিত বিবৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। কাজটি করতে হবে খুব গোপনীয়তার সঙ্গে। কারন অনেকের সংযোগ আছে আর্মিদের সঙ্গে। জানাজানি হয়ে গেলে পুরো পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যাবে। আমার খুব বিশ্বস্ত দু'জন সাংবাদিক নেতার সঙ্গে কথা বলে তাদের পরামর্শ নিয়ে কাজ শুরু করলাম। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে বিবৃতি লিখলাম। যায়যায়দিন সম্পাদক শ্রদ্ধের শফিক রেহমান ভাইকে দেখালে তিনি বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের অবদানের কথাও সংযোজন করলেন। প্রতিটি মিডিয়া অফিসে একজন করে বিশ্বস্ত সহকর্মীকে দায়িত্ব দিলাম স্বাক্ষর সংগ্রহ করার জন্য। আমি নিজে সম্পাদক ও একুশে পদক বিজয়ী সাংবাদিকদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করালাম। ৭০০ সাংবাদিক খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে সাক্ষর করলেন।

এরপর স্বাক্ষরযুক্ত কাগজগুলো ফটোকপি করে প্রতিটি অফিসের জন্য আলাদা আলাদা প্যাকেট করে সংবাদপত্র ও মিডিয়া হাউসগুলোতে পাঠালাম।

কাজটি করেছিলাম খুব গোপনীয়তার সঙ্গে। ডিজিএফআই জেনে গেলে খবরটি ছাপার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করতো। সেটা যাতে করতে না পারে সেজন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবী করে ৭০০ সাংবাদিকের বিবৃতি বার্তা সম্পাদকদের কাছে পাঠালাম কিছুটা রাত করে। আমার এ কাজে সাহায্য করেন সহকর্মী আলাউদ্দিন আরিফ, মাহবুবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন। মাহাবুব লন্ডনে ব্যারিষ্টারি করে বর্তমানে আইন পেশায় সেখানে কাজ করছেন।

এই বিবৃতির খবর ডিজিএফআই টের পায়নি। তাই গণমাধ্যমে খবর ছাপার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেনি। সংবাদপত্রে খবরটি ডাবল কলাম ও সিঙ্গেল কলামে ছাপা হয়ে যায়। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও খবরটি প্রচারিত হয়। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সাংবাদিক সমাজ দাড়িয়ে গেছেন। ডিজিএফআই বিপদে পড়ে যায়। বিশেষ করে মামুন খালেদ বিষয়টি জানতে পারেননি। ব্যর্থতার দায়ভার এসে পরে তার ওপর।

৭০০ সাংবাদিকের এই বিবৃতিতে এক নম্বর স্বাক্ষরদাতা ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য সাংবাদিক আতাউস সামাদ। এরপর শফিক রেহমান, আতিকুল আলম,রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

পরদিন যা হবার তা-ই হলো। ডিজিএফআই থেকে আমাকে ডাকা হলো একটি বৈঠকের কথা বলে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, হয়তো জবাবদিহি করতে হবে। আমার সহকর্মী ও বন্ধু লে. রুশদকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাই। রুশদকে বলা হলো কিছুক্ষণ পরে সভা হবে, আপনার থাকার দরকার নেই। তিনি চলে গেলেন। এরপর লে.কর্নেল গোলাম মাওলার অমানবিক নির্যাতনের শিকার হলাম। আমার বাবা একজন আলেমে দ্বীন ছিলেন। মসজিদের একজন খতীব ও পীর সাহেব হিসেবে আদর্শ জীবনযাপন করেছেন, মানুষের কল্যাণ করেছেন। কিন্তু ওই আর্মি অফিসার আমার বাবা এমন একজন আলেমে দ্বীনকে যে ভাষায় গালিগালাজ করেছিলেন, আমার মনে হয়ে তারচেয়ে আমার মরণ হলো না কেন? আমি ওই অফিসারকে বাবার পরিচয় দেওয়া সত্বেও তিনি কর্ণপাত করেননি গালি অব্যাহত রেখেছিলেন।

তেমনি সেদিন স্কুল থেকে ছেলেকে বাসায় নেয়ার দায়িত্ব ছিল আমার। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের অফিসে আটক থাকায় বাসায় বা স্কুলে খবর দিতে পারিনি। ফলে স্কুল কতৃপক্ষ ছুটির কয়েক ঘন্টা পর ছেলেটিকে বাড়ি পৌঁছায়।

সাংবাদিকদের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তারা রাতে প্রেসক্লাব থেকে বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিলে খবর পেয়ে ডিজিএফআই রাতে অবশেষে আমাকে ছেড়ে দেয়।

এত বছর পর আজ সেই মামুন খালেদ তাদের সেই ঘৃণ্য অপকর্মের জন্য ধরা পড়েছেন, খবরটি দেখে খুব ভালো লাগছে। পাপের জন্য কিছুটা হলেও প্রায়শ্চিত্ব করুন মামুন খালেদ।

লেখক: সৈয়দ আফদাল আহমদ, সিনিয়র সাংবাদিক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন