


কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন দেশের একটি প্রথম শ্রেণির সিটি কর্পোরেশন, যা ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক সচেতনতার দিক থেকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লার মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরীর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন একজন উচ্চশিক্ষিত, সৎ, নিষ্ঠাবান, কর্মঠ, দূরদর্শী ও দক্ষ সংগঠক—যিনি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এসব গুণাবলীর সমন্বয়ে ড. শাহ মো. সেলিম নিঃসন্দেহে একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বলে কুমিল্লাবাসী মনে করেন।
ড. শাহ মো. সেলিম ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াস্থ আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯৮০-৮১ শিক্ষাবর্ষে তিনি স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পূর্বে তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবন মেধা, অধ্যবসায় ও নেতৃত্বগুণের উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে।
১৯৫৮ সালের ৫ এপ্রিল কুমিল্লা সদর উপজেলার যশপুর, কালিবাজার গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ঠাকুরপাড়ায় বসবাস করছেন। তাঁর পিতা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার সুজাত আলী ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বাংলাদেশ রেলওয়ে। তাঁর সহধর্মিণী ড. জে. এন. লিলি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কুমিল্লা মহিলা কলেজের নির্বাচিত ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পেশায় অধ্যাপনা করেন। একটি শিক্ষিত ও আদর্শ পরিবারে বেড়ে ওঠা ড. সেলিমের ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ গঠনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৯-৭০ সালের গণআন্দোলন এবং কুমিল্লায় উচ্চশিক্ষা বিস্তারের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০-৭১ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে মহান স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে ১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ তিনি গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন।
১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (যুবদল)-এর কুমিল্লা জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপির কুমিল্লা জেলা প্রচার সম্পাদক হন। ১৯৭৮-৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন ছাত্রনেতা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি একজন তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং ১৯৮০ সালে চাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৮৩ সালে কুমিল্লায় বিএনপিকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৮৫ সালে যুবদলের নির্বাচিত সভাপতি হন। ১৯৮৩-১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮২ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে কারাবরণ করেন।
১৯৯১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত কুমিল্লার বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থীদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ দলীয় কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদান রাখে।
বিগত বছরগুলোতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বিগত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি সাবেক হুইপ এবং বর্তমান এমপি জনাব মহিরুল হক চৌধুরীর সঙ্গেও বিভিন্ন আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে ড. শাহ মো. সেলিমের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮০ সালে কুমিল্লায় একটি সরকারি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন, যার ফলশ্রুতিতে কুমিল্লায় ম্যাটস প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া কুমিল্লায় একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ২০০৩ সালে তিনি বেসরকারি উদ্যোগে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে “ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ” প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বহু শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
শুধু শিক্ষা নয়, কুমিল্লার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর অবদান ব্যাপক। তিনি কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন, কচিকাঁচার মেলা, নজরুল পরিষদ, কুমিল্লা টাউন হল, কালচারাল কমপ্লেক্স, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও রোটারি ক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ড. শাহ মো. সেলিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন “ইউনিভার্সিটি ক্লাব কুমিল্লা”-র সম্মানিত সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বে ক্লাবটি স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রশংসা অর্জন করেছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তিনি একজন দক্ষ সংগঠক, প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী নেতা। সম্প্রতি কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে তাঁর নেতৃত্ব ছিল সুসংগঠিত ও কার্যকর।
কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ড. শাহ মো. সেলিমের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সামাজিক সম্পৃক্ততা তাঁকে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে একটি যোগ্য ও সময়োপযোগী পছন্দের প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে সাধারণ চায়ের দোকানসহ সর্বত্র শাহ সেলিমের নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং কুমিল্লা নগরীর আধুনিকায়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশাই এখন কুমিল্লাবাসীর।
লেখক: শেখ ফরিদ উদ্দিন সাংবাদিক ও সমাজকর্মী
মন্তব্য করুন