

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দুদিন পর, ১৫ ফেব্রুয়ারির সকাল। রাজধানীর বাংলামোটর মোড়। ২০-৩০ জন লোক একজনকে ধাওয়া করছে। মুখ রক্তাক্ত। এরই মধ্যে মারধর করা হয়েছে, এখন সম্মিলিতভাবে ‘শাস্তি’ দেওয়ার প্রস্তুতি। তিনি দৌড়ে সিগন্যাল পার হয়ে পুলিশের সহায়তা চান। আশপাশের অনেকে প্রতিবাদ করেন, কিন্তু উন্মত্ত জনতা শুনতে নারাজ।
ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, এটি গত দেড় বছরে দেশে ঘটে যাওয়া অসংখ্য মব সহিংসতার ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচন শেষে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও কীভাবে এই সাহস তৈরি হয়? মব কি তবে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেছে?
শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও, তাদের সময়কালে মব সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই ওই সময়কে ‘মবের শাসন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়কালে এ সংখ্যা ২৯৩। ঢাকায় সর্বাধিক ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এরপর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
আসকের বিশ্লেষণ বলছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে। ‘তৌহিদি জনতা’র নামে সংঘটিত কিছু ঘটনায় ভাঙচুর, হেনস্তা ও সহিংসতা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ১৪১ ধারা অনুযায়ী, পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি বেআইনি উদ্দেশ্যে একত্রিত হলে সেটি ‘বেআইনি সমাবেশ’। তা সহিংস হলে ‘দাঙ্গা’। আর মবের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটলে তা ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। অর্থাৎ আইন স্পষ্ট। প্রশ্ন আইন প্রয়োগে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ঘটনার পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান কঠোরতা ছিল না এমন অভিযোগ রয়েছে। এমনকি আদালত প্রাঙ্গণেও আসামির ওপর হামলার নজির তৈরি হয়েছে, যা বিচারব্যবস্থার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তবে আশার কথা, নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে ‘মব কালচার’ সহ্য করা হবে না। দাবি-দাওয়া থাকলে আইনানুগভাবে মিছিল-সমাবেশ করা যাবে, কিন্তু সড়ক অবরোধ বা সহিংস মবের কোনো স্থান নেই।
এই বক্তব্য জনমনে স্বস্তি ফেরাতে পারে। তবে কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপই বেশি জরুরি। মব সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন হবে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে কোনো সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চাইতে হবে।
গত দেড় বছর দেশের মানুষ মব আতঙ্কে এক ধরনের দমবন্ধ পরিবেশে বাস করেছে। এখন প্রয়োজন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট বার্তা—রাষ্ট্রের চেয়ে বড় কেউ নয়, মবও নয়। প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই বার্তা বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়।
মন্তব্য করুন
