মঙ্গলবার
১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কেন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল জুলাই বিদ্রোহ

আবু সাঈদ
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:৫০ এএম
ঢাকার রাজপথে  জনতার তরঙ্গ
expand
ঢাকার রাজপথে জনতার তরঙ্গ

সময় দ্রুত বয়ে যায়, কিন্তু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় কিছু তারিখ চিরকাল রয়ে যায় অগ্নিময় অক্ষরে লেখা। কোটা সংস্কারের দীর্ঘ ৩৬ দিনের আন্দোলন থেকে যে অভাবনীয় গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা কেবল সরকারের পতন নয়, গোটা জাতির রাজনৈতিক স্রোতধারাই বদলে দিয়েছিল। সেই রক্তাক্ত জুলাই এখন ইতিহাসের মাইলফলক।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসন মানুষের বুকের ভেতর চাপা ক্ষোভের পাহাড় জমিয়ে তুলেছিল। অধিকারহীনতা, দমন-পীড়ন, গুম-খুন, বিচারহীনতা, ভোটাধিকার হরণ, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি মানুষের জীবনে নীরব বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল আস্থা, নাগরিক মর্যাদা, এমনকি ভবিষ্যতের প্রতি আশাও।

এই দীর্ঘ দমননীতির শ্বাসরোধী পরিবেশেই জমে উঠেছিল দ্রোহের আগুন। শিক্ষার্থীদের হাতে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনে, আর সেখান থেকেই গড়ে ওঠে জনবিস্ফোরণ—যা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে জায়গা করে নেয় জুলাই অভ্যুত্থান নামে।

সরকার যখন শান্তিপূর্ণ দাবিকে রক্তাক্তভাবে দমন করল, আন্দোলন তখন আর কেবল একটি নীতির লড়াই থাকল না, হয়ে উঠল মুক্তির যুদ্ধ। রংপুরের আবু সাইদের বুক চিরে ঝরতে থাকা রক্ত সেই আন্দোলনকে জাতীয় গণআন্দোলনে রূপ দিল। একে একে ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক, পেশাজীবী, নারী, সংখ্যালঘু, ডান, বাম, মধ্যপন্থি সব রাজনৈতিক শক্তি একসাথে মিশে গেল একই দাবিতে—স্বৈরশাসনের অবসান চাই।

শেখ হাসিনার ১৬ বছরের ক্ষমতাকালীন স্বেচ্ছাচার, মিথ্যা মামলা, বিরোধী দল দমন, ভোটবিহীন নির্বাচন, উন্নয়নের নামে লুটপাট আর ক্ষমতাসীনদের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠা—সবকিছু মিলে ক্ষোভের এক জ্বালাময়ী আগ্নেয়গিরি তৈরি করেছিল। তার সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য আর আশাহীনতার চাপ সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছিল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শাসক যতই শক্তিশালী ভাবুক, জনগণের সম্মিলিত শক্তির কাছে তার সব ক্ষমতা ধুলিসাৎ হতে সময় লাগে না। একসময় যেমন আইয়ুব খানের “উন্নয়ন দশক” সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারেনি, তেমনই শেখ হাসিনার তথাকথিত “উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ” জনগণের ক্ষুধা, ক্রোধ ও ক্ষোভ দমন করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই মহাআন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছিল, দেশের মালিক জনগণ, আর ক্ষমতা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ পেল দ্বিতীয় মুক্তি — স্বৈরাচার পতনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক চেতনার পুনর্জাগরণ।

ইতিহাসের অমোঘ সত্য আবারও স্পষ্ট হলো: অন্যায়, জুলুম আর লুটপাটের ওপর কোনো সরকার চিরকাল টেকে না। জনগণ চুপ থাকতে পারে, কিন্তু তারা ভুলে যায় না। যখন সেই ক্ষোভের বাঁধ ভাঙে, তখন আর কোনো শক্তিই তাকে থামাতে পারে না।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X