বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দারিদ্র্য কমানো শিখতে বিদেশ যেতে চান ১০৪ কর্মকর্তা, খরচ ১০ কোটি 

মোঃ তন্ময় ইসলাম
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম
ছবি: এনপিবি গ্রাফিক্স
expand

এবার দারিদ্র্য কমানোর কৌশল শিখতে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিতে যেতে চান এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের ১০৪ জন কর্মকর্তা। আর এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্য বিমোচনের পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পে কুমিল্লায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি টাকার বেশি। বিভিন্ন ধরনের অনুদানে খরচ হবে আরও প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ‘সেমাউল প্লাস অ্যান্ড পোভার্টি প্রোগ্রাম’ সংক্ষেপে এসপিইপিপি (SPEPP) নামের এই প্রকল্পের মোট ব্যয় হবে ৫৭৩ কোটি ২০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।

প্রশ্ন উঠেছে, দারিদ্র্য কমানোর মতো একটি কাজে এত কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ কতটা জরুরি। কারণ, যে মডেলকে সামনে রেখে এই প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে: সমবায়, স্থানীয় নেতৃত্ব, জনগণের অংশগ্রহণ, কৃষি উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতা। বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে এসব ধারণা বহু বছর ধরেই বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি কুমিল্লা, ফেনী ও বগুড়ার ১১৪টি গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সেমাউল মডেল এবং বাংলাদেশের কুমিল্লা মডেলের সমন্বয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য গ্রামীণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে দারিদ্র্য কমানো।

প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১০৪ কর্মকর্তাকে ১২টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর বাইরে দেশে ৩৮৬টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছে আরও ৭৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। বিদেশ ও দেশীয় প্রশিক্ষণ মিলিয়ে এ খাতেই ব্যয় হবে প্রায় ৮৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

শুধু প্রশিক্ষণেই এত বড় ব্যয়ের পাশাপাশি কুমিল্লায় একটি ‘এসপিইপিপি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১০ দশমিক ৭১ শতাংশই যাবে এই কেন্দ্র নির্মাণে। প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার পরও আলাদা করে ৬১ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এর বাইরে ১০টি কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯৭ দশমিক ৪৬ লাখ টাকা, যা প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

প্রকল্পের বড় ব্যয়ের আরেকটি খাত হলো বিভিন্ন ধরনের অনুদান। কমিউনিটি অবকাঠামো ও অকৃষি ব্যবসার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৩৩৮ দশমিক ১৭ লাখ টাকা বা প্রায় ৭৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। কৃষি উপকরণ, কৃষি প্রকল্প ও অবকাঠামোর জন্য রাখা হয়েছে আরও ৫৬৩৯ দশমিক ৭ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। দুই খাতে অনুদানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ বিদেশ ও দেশীয় প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ এবং অনুদান এই কয়েকটি খাতেই ব্যয় হবে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে অফিস সরঞ্জাম ও যানবাহন কেনার জন্যও রয়েছে বড় অঙ্কের বরাদ্দ।

প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অফিস সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৫৫ দশমিক ০৪ লাখ টাকা বা প্রায় ১৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। তিনটি জিপ কেনায় প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ৪১টি মোটরসাইকেলের জন্য প্রায় ১ কোটি ১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কম্পিউটার, ক্যামেরা, আসবাবসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্যও রয়েছে আলাদা বরাদ্দ।

নতুন প্রকল্পের প্রস্তাবেই আগের একটি প্রকল্পের ব্যর্থতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ২০টি গ্রামে ‘বার্ড-কোইকা’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তা, স্কুল, পানি সুবিধা, কমিউনিটি সেন্টার ও জীবিকা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বিদেশি অনুদান শেষ হওয়ার পর দুর্বল নজরদারি, স্থানীয় সরকারের কম মালিকানা এবং গ্রাম সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রকল্পটির কার্যক্রম টেকসই হয়নি।

এই অভিজ্ঞতার পরও নতুন প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে ভবন নির্মাণ, বিদেশে প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে আগের প্রকল্পের মতো ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের কার্যক্রমও টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, এসব প্রকল্পে বিদেশে প্রশিক্ষণের কোনো প্রয়োজন নেই। বিদেশি অর্থায়নের কারণেই হয়তো এই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি এমনভাবে নকশা করা উচিত, যাতে বেশি মানুষ আর্থিক ও সামাজিকভাবে উপকৃত হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় খরচ করে অর্থ নষ্ট করলে মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেক বদলে গেছে। বাজার, প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তারের কারণে গ্রামের অর্থনীতি এখন আগের মতো বিচ্ছিন্ন নয়। তাই বিদেশি কোনো মডেল শেখার চেয়ে বর্তমান বাস্তবতায় কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সরকার অবশ্য বলছে, কুমিল্লা বা দক্ষিণ কোরিয়ার সেমাউল মডেল হুবহু অনুসরণ করা হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে মডেল দুটির কার্যকর উপাদানগুলো ব্যবহার করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রদীপ কুমার মহত্তম এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘দুঃখিত, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আপনি ভুল জায়গায় ফোন করেছেন।’ অথচ প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন কমিটির সভায় তিনি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অংশ নেন।

একই বিষয়ে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), কুমিল্লার মহাপরিচালক সাইফ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank