


জ্ঞানকে সমাধানে, গবেষণাকে পণ্যে এবং ধারণাকে উদ্যোগে রূপান্তরের পাশাপাশি উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেছেন, শুধু উদ্ভাবন করলেই হবে না; উদ্ভাবকদের অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব, মেধাস্বত্বের সুরক্ষা এবং সর্বোপরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আগামী ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার নভোথিয়েটারে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এবারের মেলার প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেট টু মার্কেট’। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মেধা, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনাময় ধারণার কোনো ঘাটতি নেই। শিক্ষার্থী, গবেষক, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন সমাধান তৈরি করছে। তবে এসব উদ্যোগকে বিনিয়োগ, শিল্প ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ সেই সংযোগ তৈরির লক্ষ্যেই আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় ব্যক্তিগত উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ ফাউন্ডারসহ শতাধিক উদ্ভাবক এক হাজারের বেশি উদ্ভাবন প্রদর্শন করবেন। এতে দেশের ৭৩টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক, করপোরেট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা অংশ নেবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘উদ্ভাবন কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হতে পারে না। এর জন্য সরকার, শিক্ষাঙ্গন, শিল্পখাত, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।’ এই সমন্বয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী, টেকসই ও বাজারমুখী ইনোভেশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই মেলার অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
মেলা সফল করতে বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্ভাবক, গবেষক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তিনি বলেন, উদ্ভাবন ও উদ্ভাবকদের জাতির সামনে তুলে ধরা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি এবং উদ্ভাবন কীভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে এ বিষয়ে জাতীয় সংলাপ তৈরিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আগামী ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর নভোথিয়েটারে মেলা পরিদর্শন এবং উদ্ভাবকদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাদের উদ্ভাবনের গল্প দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও উদ্ভাবনী, প্রতিযোগিতামূলক ও ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
মেলায় ব্যক্তিগত উদ্ভাবক, শিক্ষার্থী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, সরকারি সংস্থা, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা, এসএমই, সেবা প্রদানকারী, স্টার্টআপ ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তাদের একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। এর মাধ্যমে উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী, গবেষক, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যোগাযোগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, তিন দিনে ছয়টি প্লেনারি সেশন, ছয়টি প্যারালাল সেশন ও পাঁচটি গোলটেবিল বৈঠকসহ মোট ১৭টি সেশন ও সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এসব আয়োজনে নীতিনির্ধারক, থিংক ট্যাংক, শিক্ষাবিদ, শিল্পনেতা, গবেষক, তরুণ উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেবেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের উদ্ভাবন প্রয়োজন, কোন উদ্ভাবন বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং সেগুলো বাজারে নিতে কী ধরনের নীতি, বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন মেলার আলোচনায় এসব বাস্তব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।
মেলার অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে ‘ইনোভেশন হাব’ গড়ে তোলার কথা জানিয়ে বিজ্ঞান সচিব বলেন, মেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে কার্যক্রম শেষ হবে না। বরং মেলায় প্রদর্শিত এক হাজারের বেশি উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে একটি সংযুক্ত ইনোভেশন হাব গড়ে তোলার কাজ শুরু হবে। এর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন চিহ্নিত করে সেগুলোর উন্নয়ন, অর্থায়ন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া হবে।
বিজ্ঞান সচিব আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর মেলার ‘পলিসি পার্টনার’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) টেকনিক্যাল পার্টনার এবং দ্য ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে সহযোগিতা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ উদ্ভাবন, অর্থায়ন, মেধাস্বত্ব, নীতি, শিল্প ও বিনিয়োগের মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মেলায় ১৪টি অগ্রাধিকার খাতে উদ্ভাবন প্রদর্শিত হবে। খাতগুলো হলো, ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি; ইনফরমেশন ও ডিজিটাল টেকনোলজি; স্পেস, অ্যারোস্পেস ও অ্যাস্ট্রোনমি; হেলথ, মেডিকেল ও লাইফ সায়েন্স; আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, অটোমেশন ও রোবোটিক্স; অ্যাগ্রিকালচার ও ফুড টেকনোলজি; ন্যানোটেকনোলজি ও অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস; ক্লাইমেট, এনভায়রনমেন্ট ও সাসটেইনেবিলিটি; ফিনটেক, কমার্স ও বিজনেস; ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানুফ্যাকচারিং ও হার্ডওয়্যার; এনার্জি, পাওয়ার ও মোবিলিটি; এডুকেশন, স্কিলস ও হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট; স্মার্ট সিটি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও আরবান সলিউশনস এবং সোশ্যাল, ক্রিয়েটিভ ও ইনক্লুসিভ সলিউশনস।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে মেলাটি বাস্তবায়ন করছে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর। ইমপ্লিমেন্টেশন পার্টনার হিসেবে রয়েছে স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেড।
প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।