রবিবার
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
expand

রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংস্থাগুলোর জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেন অন্য কোনো বৈশ্বিক সংঘাত বা সংকটের আড়ালে চাপা না পড়ে এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় সব সময় সক্রিয় থাকে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই—আশ্রিত প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন (ইউএনএইচসিআরের হিসাবে ১ দশমিক ২ মিলিয়ন) বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিককে যেন আমরা পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারি। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তা ও নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি বলেন, বিশ্ব রাজনীতির নেতৃস্থানীয় দেশগুলো ও জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা দিয়ে আসছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট এখন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ‘সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।’

ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও পরিবেশও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া ও নিয়ন্ত্রিত যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করাসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার আবারও সফলভাবে প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ গঠন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সমন্বয়ের জন্য তাঁর নেতৃত্বে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিও সক্রিয় রয়েছে। বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সরকার ‘হোল-অফ-গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতিতে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

অনির্দিষ্টকালের মানবিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদ কমিয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রদত্ত মানবিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদকে কমিয়ে দিতে পারে। তাই জরুরি ত্রাণ সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের দ্রুত একটি ‘ট্রানজিশনাল স্ট্র্যাটেজি’ বা রূপান্তরকালীন কৌশলে যেতে হবে।’

এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বক্তব্য দেন। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রশাসনিক সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

আইজিসিএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী।

গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী সেলের প্রধান ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, আইইউবির অধ্যাপক ড. কাজী মাহমুদুল রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নুরুল হুদা সাকিব, ইউল্যাবের সহকারী অধ্যাপক অবন্তী হারুন, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং দৈনিক প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি রাহীদ এজাজসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, টেকসই আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ, জাতীয় ঐক্য ও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয়ে বাংলাদেশ দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank