


একবার ভাবুন, পথের দুই পাশে বরফে ঢাকা পাহাড়। সামনে খরস্রোতা নদী, কোথাও নৌকা নেই। সামনে রয়েছে একটি নড়বড়ে সেতু’ আবার পেছন থেকে তাড়া করছে শত্রু। এমনকি হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে ওঠার সময় পিঠে বয়ে নিতে হচ্ছে ভারী বোঝা। সঙ্গে নেই পর্যাপ্ত খাবার, নেই শীত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা। দিনের পর দিন হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গীদের কেউ ক্ষুধায়, কেউ ঠান্ডায়, কেউ আবার ক্লান্তিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।
এমন পরিস্থিতিতেই হয়েছিল চীনের কমিউনিস্ট রেড আর্মির ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত চলা ‘লং মার্চ’। যা পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত চলা সবচেয়ে বড় ‘লং মার্চ’ হিসেবে পরিচিত। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই এই ‘লং মার্চের’ যাত্রা শুরু হয়েছিল আনুমানিক এক লাখ সৈন্য নিয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত এটি শেষ করতে পেরেছিলেন মাত্র কয়েক হাজার।
অর্থাৎ যাত্রা শুরু করা প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই পথের কোনো এক পর্যায়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন। কেউ মারা গেছেন, কেউ পালিয়ে গেছেন, কেউ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
এই ভয়াবহ অভিযানের মধ্য দিয়েই অবশ্য চীনের ইতিহাসে তৈরি হয় নতুন এক অধ্যায়। সামনে উঠে আসেন মাও সেতুং। পরবর্তী সময়ে তিনিই কমিউনিস্ট বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয়তাবাদী কুওমিনতাংকে পরাজিত করেন এবং ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করেন।
কেন শুরু হয়েছিল লং মার্চ
১৯৩৪ সালের দিকে চীনের কমিউনিস্ট রেড আর্মি ভয়াবহ চাপের মুখে পড়ে। তাদের বিরুদ্ধে ছিল জাতীয়তাবাদী কুওমিনতাং বাহিনী, যার নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেলিসিমো চিয়াং কাই-শেক। জনবল, অস্ত্র এবং সামরিক সক্ষমতা—সব দিক থেকেই জাতীয়তাবাদীরা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল।
১৯৩৩ সালে চীনের জাতীয়তাবদীরা ‘এনসার্কলমেন্ট ক্যাম্পেইন’ নামে একটি সামরিক অভযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে তারা কমিউনিস্টদের ঘাঁটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং একে একে সেগুলো ধ্বংস করে ফেলে। এতে পরাজয় ও ব্যাপক প্রাণহানিতে কমিউনিস্ট বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিউনিস্ট বাহিনীর বড় একটি অংশ পশ্চিম ও উত্তরের দিকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই পশ্চাদপসরণই পরবর্তীতে ইতিহাসখ্যাত লং মার্চে পরিণত হয়।
অসুস্থ মাও, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী
লং মার্চ শুরুর সময় মাও সেতুং নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং এর আগে কমিউনিস্ট পার্টিতে তার পদাবনতি হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে মার্চের প্রথম কয়েক সপ্তাহ তাকে দুই সৈন্যের বহন করা পালকিতে করে নিয়ে যেতে হয়।
অন্যদিকে মাওয়ের স্ত্রী হে জিজেনও তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। দীর্ঘ যাত্রার মধ্যেই তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে এত দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় একটি পরিবারের কাছে শিশুটিকে রেখে যেতে হয়।
খাবারের জন্য গ্রামবাসীদের ওপর নির্ভরতা
সামনে এগোতে গিয়ে রেড আর্মি সবচেয়ে বড় যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়, তার একটি ছিল খাদ্যসংকট। অনেক এলাকায় তারা স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করত।
কেউ খাবার দিতে অস্বীকার করলে জিম্মি করে মুক্তিপণ চাওয়া কিংবা জোর করে রেড আর্মিতে যোগ দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি বর্ণনায় এই ইতিহাসের অন্য একটি ছবি তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, কৃষকেরা রেড আর্মিকে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল এবং স্থানীয় যুদ্ধবাজদের শাসন থেকে মুক্তির জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল।
লুডিং সেতুর যুদ্ধ
লং মার্চের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে লুডিং সেতুর যুদ্ধ। ১৯৩৫ সালের ২৯ মে সিচুয়ান প্রদেশে দাদু নদীর ওপর অবস্থিত এই ঝুলন্ত সেতু রেড আর্মির নিয়ন্ত্রণে আসে।
কমিউনিস্ট প্রচারণায় ঘটনাটিকে অসাধারণ এক বীরত্বগাথা হিসেবে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, মাত্র ২২ জন নির্বাচিত সৈন্য প্রচণ্ড গুলির মধ্যে সেতু দখলের জন্য এগিয়ে যান। প্রতিপক্ষ সেতুর কাঠের পাটাতন খুলে ফেলেছিল বলে তারা নাকি লোহার শিকল ধরে ঝুলে ঝুলে নদী পার হন।
তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে ঘটনাটির অন্য একটি চিত্র পাওয়া যায়। রেড আর্মির প্রতিপক্ষ ছিল স্থানীয় এক যুদ্ধবাজের তুলনামূলক ছোট বাহিনী এবং তাদের অস্ত্রও খুব আধুনিক ছিল না। বরং মেশিনগান ছিল কমিউনিস্ট বাহিনীর কাছেই।
অভিযানের আগে রেড আর্মি স্থানীয় কয়েকজন মানুষকে সেতু পার হতে বাধ্য করেছিল বলে কিছু বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। প্রতিপক্ষের গুলিতে তারা নিহত হওয়ার পর কমিউনিস্ট সৈন্যরা আক্রমণ শুরু করে এবং স্থানীয় বাহিনী দ্রুত পিছু হটে।
অর্থাৎ লুডিং সেতুর যুদ্ধ বাস্তব ঘটনা হলেও পরবর্তী সময়ে এর কিছু অংশকে রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে আরও নাটকীয় ও বীরত্বপূর্ণ রূপ দেওয়া হয়।
তুষারের পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল
১৯৩৫ সালের জুনে রেড আর্মির প্রথম বাহিনী তুষারে ঢাকা জিয়াজিনশান পর্বতমালার একটি দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করে। অঞ্চলটির উচ্চতা ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট।
এত উঁচু ও প্রতিকূল পরিবেশে সৈন্যদের প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল বিপুল ওজনের সামগ্রী—কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ থেকে ৮০ পাউন্ড পর্যন্ত। তীব্র ঠান্ডা, তুষার এবং খাবারের সংকটের কারণে এই পথেই বহু মানুষ প্রাণ হারান।
এরপর মাওয়ের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় ঝাং গুওতাওয়ের নেতৃত্বাধীন চতুর্থ রেড আর্মি। ঝাংয়ের বাহিনীতে তখন প্রায় ৮৪ হাজার সৈন্য ছিল। বিপরীতে দীর্ঘ যাত্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত মাওয়ের বাহিনীতে অবশিষ্ট ছিল আনুমানিক ১০ হাজার ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত সৈন্য।
দুই বাহিনীর এই মিলনকে পরে ‘গ্রেট জয়নিং’ নামে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাহিনী দুটি একত্রিত হওয়ার পরই নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে মাও এবং ঝাংয়ের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে।
নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ভেঙে গেল ঐক্য
মাও চেয়েছিলেন উত্তর দিকে যেতে। তার আশা ছিল, অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সরবরাহ পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ঝাং গুওতাও যেতে চেয়েছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিমে, যেখানে তার নিজস্ব ক্ষমতা ছিল।
ইতিহাস বলছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এক পর্যায়ে ঝাং মাওকে আটক করে প্রথম রেড আর্মির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও পরিকল্পনা করেন। তবে তার পাঠানো সাংকেতিক বার্তা শেষ পর্যন্ত মাওয়ের অনুগত এক কর্মকর্তার হাতে পড়ে যায়। আর এতেই সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
এরপর ঝাং নিজের বাহিনী নিয়ে দক্ষিণে চলে যান। জাতীয়তাবাদী বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরের মাসেই তার চতুর্থ রেড আর্মি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।
‘গ্রেট মরাস’: যেখানে মাটিই হয়ে উঠেছিল শত্রু
লং মার্চের সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর একটি ছিল ‘গ্রেট গ্রাসল্যান্ড’, যাকে অনেক সময় ‘গ্রেট মরাস’ও বলা হয়। যারা এই অঞ্চল পার হয়ে বেঁচে ফিরেছিলেন, তাদের অনেকের কাছেই পুরো অভিযানের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ছিল এই বিশাল জলাভূমি।
প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই অঞ্চল গ্রীষ্মকালে নানা ধরনের বুনো ফুলে ভরে উঠলেও এর নিচের মাটি ছিল অত্যন্ত নরম ও বিপজ্জনক। ক্লান্ত সৈন্যদের পা কাদার মধ্যে গভীরভাবে ঢুকে যেত। অনেকেই সেই কাদা থেকে আর নিজেদের বের করে আনতে পারতেন না।
জ্বালানি কাঠের অভাবে সৈন্যদের ঘাস পোড়াতে হতো এবং সেই আগুনে সামান্য শস্য রান্না বা সেঁকে খেতে হতো। খাবারের অভাব, প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে বহু সৈন্য সেখানে মারা যান।
শেষ পর্যন্ত শানসিতে
১৯৩৫ সালের অক্টোবর নাগাদ মাওয়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম রেড আর্মিতে সৈন্যসংখ্যা কমে প্রায় চার হাজারে দাঁড়ায়।
শানসি প্রদেশে পৌঁছানোর পর তারা ঝাং গুওতাওয়ের বাহিনীর অবশিষ্ট অংশ এবং দ্বিতীয় রেড আর্মির সঙ্গে মিলিত হয়। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ উত্তরাঞ্চলে পৌঁছানোর পর কমিউনিস্ট বাহিনী নতুন করে নিজেদের সংগঠিত করার সুযোগ পায়।
যে বাহিনী কিছুদিন আগেও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ছিল, পরবর্তী বছরগুলোতে সেটিই ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদীদের পরাজিত করে চীনের মূল ভূখণ্ডের ক্ষমতা দখল করে।
বিপর্যয় যখন বিজয়ের প্রতীক
মানবিক ক্ষয়ক্ষতির বিচারে লং মার্চ ছিল ভয়াবহ বিপর্যয়। প্রায় এক লাখ সৈন্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে শেষ পর্যন্ত শানসিতে পৌঁছেছিল আনুমানিক সাত হাজার। অর্থাৎ ১০ জনে ৯ জনের মতো পথেই হারিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্য তাদের সবাই মারা যাননি; কেউ পালিয়ে গিয়েছিলেন, কেউ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।
তারপরও কমিউনিস্ট ইতিহাসে লং মার্চকে মহান বিজয় হিসেবে তুলে ধরা হয়। কারণ এই পশ্চাদপসরণ রেড আর্মিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মাও সেতুংকে দলের প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।