

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


চেঙ্গি স্কোয়ার খাগড়াছড়ি সদরের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে মুক্তমঞ্চ, শাপলা চত্বর ও খাগড়াছড়ি বাজার অবস্থিত, গত কয়েকদিন ধরে ১৪৪ ধারা জারির কারণে একেবারে নিরব ও শান্ত।
পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের পর অবরোধ প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় চেঙ্গি স্কোয়ারের পাশে একটি টং দোকানে ১৫–২০ জন পাহাড়ি ও বাঙালি নাগরিক আড্ডা দিচ্ছেন। আইন শৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থায় টহল দিচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ে চলমান সংঘাতের পেছনে তিনটি রহস্যময় অ্যাজেন্ডা রয়েছে, যা শুধু খাগড়াছড়িতে নয়, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের মানুষও শুনেছেন:
সেনা-বাঙালি হটানো ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করা – যে কোনো ইস্যুতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের মাধ্যমে সেনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া।
অস্ত্র প্রদর্শন ও শক্তি প্রদর্শন – পাহাড়িরা প্রকাশ্যে অটোমেটিক অস্ত্র প্রদর্শন করে নিজেদের ক্ষমতা দেখায়।
আটক হলেও দ্রুত মুক্তি – কেউ আটক হলে অদৃশ্য ইশারায় দ্রুত মুক্তি পায়।
খাগড়াছড়ি চেঙ্গি স্কোয়ারে আড্ডায় শিক্ষক শহীদুল ইসলাম বলেন, “যে কোনো ঘটনা ঘটলে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। ধর্ষণ, মারামারি বা অস্থিরতার যেকোনো ইস্যুতে স্লোগান তোলা হয় ‘সেনা মুক্ত পাহাড় চাই’। এই কার্যক্রমের পেছনে রহস্যময় শক্তি কাজ করছে। রাষ্ট্র যদি পাহাড়ে নিয়মিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও উপস্থিতি নিশ্চিত না করে, তবে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।”
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ইবতেহাজ আরাফাত উল্লেখ করেন, “স্বাধীনতার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে কতজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিহত হয়েছে, তা গোপন রাখা হয়েছে। পাহাড়িরা অস্ত্র প্রদর্শন করে, সেনা-বিজিবি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এই অস্ত্র কিভাবে তাদের কাছে আসে, তা রহস্যময়।”
রেনু ত্রিপুরা বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলে আইনের কার্যকারিতা স্বাভাবিকভাবে নেই। সমতলে আইন কার্যকর হলেও পাহাড়ে অস্ত্রধারীরা অটোমেটিক অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। যখন তাদের আটক করা হয়, অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে দ্রুত মুক্তি পায়। এখানে এক দেশ, দুই ধরনের আইন প্রয়োগ হয়।”
উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপের কার্যক্রম
পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে চারটি মূল উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয়:
জেএসএস (সন্তু লারমা)
জেএসএস (এম এন লারমা)
ইউপিডিএফ (প্রসীত)
ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)
এই গ্রুপগুলো তাদের জাতিগত অধিকার আদায়ের নামে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছে। তারা অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ এবং নারী নির্যাতনের মতো অপরাধও চালাচ্ছে। বিশেষ করে জেএসএস (সন্তু লারমা) এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপ নারী নির্যাতনে বেশি সক্রিয়। স্থানীয় প্রশাসন মনে করছে, পার্বত্য অঞ্চলে ভারত, চীন ও মিয়ানমারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এজেন্ডা লুকিয়ে রয়েছে।
সেনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, পাহাড়ে যে কোনো ইস্যুতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না রাখলে নির্বাচনের আগে বড় অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে। ইউপিডিএফের গুলিতে পূর্বে ৩ জনের মৃত্যু ও অর্ধশতাধিক সেনা-বিজিবি আহত হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিলা ঝুমা বলেন, “বাংলাদেশের আইন সকল নাগরিকের জন্য সমান। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র আইন, ১৮৭৮ অনুযায়ী অবৈধ অস্ত্র রাখা, বহন বা ব্যবহার বেআইনি। তবে পাহাড়ে আইন প্রয়োগে শৈথিল্য দেখা যায়। স্থানীয়দের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান, আইন প্রয়োগ সমতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।”
বিশ্লেষক মন্তব্য
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষজ্ঞ মেজর নাসিম হোসেন (অব.) বলেন, “খুবই ক্ষুদ্র সংখ্যার এই জনগোষ্ঠী দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সুবিধা এবং শিক্ষার উন্নতি সত্ত্বেও পাহাড়ি গ্রুপের দাবির কারণে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।”
সুজন খাগড়াছড়ি সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, “পাহাড়ি-বাঙালি মতবিরোধ দীর্ঘদিনের। সেনা উপস্থিতি ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। ভারত ও মিয়ানমারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্র মোকাবেলার জন্য প্রশাসন এবং রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে পাহাড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর এমদাদ যোগ করেন, “পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিটি গ্রুপ ভিন্ন মতাদর্শে চলে। সেনা ক্যাম্প ছাড়া প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য যৌথ উদ্যোগ অপরিহার্য।”
মন্তব্য করুন
