


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। দায়িত্ব নেয়ার পরে 'সবার আগে বাংলাদেশ' স্লোগান সামনে রেখে একাধিক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতির উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণাও করেছেন তিনি। দখল চাঁদাবাজি এবং বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার অঙ্গীকার শোনা গিয়েছে তার কণ্ঠে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় মিতব্যয়িতা, স্বচ্ছতা, সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলাচল এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে প্রটোকল কমিয়ে রাজধানীর যানজটের মধ্যে চলাচলসহ একাধিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া শনিবারেও অফিস করার সিদ্ধান্ত এবং সচিবালয় নির্ধারিত সময়ের আগেই উপস্থিত হচ্ছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এমন নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পক্ষ থেকে ভূয়সী প্রশংসা করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের সুবিধা বিবেচনা করে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
বিএনপির নব নির্বাচিত কয়েকজন সংসদ সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গেল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের শপথ কক্ষে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পর সংসদীয় নেতা হিসেবে দলীয় এমপিদের নিয়ে সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে তিনি সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় এমপিদের নিয়ে একঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে নির্বাচিত এমপিদের কাছে তাদের মতামত জানতে চান তিনি।
এসময় বেশ কিছু নিজস্ব চিন্তা তুলে ধরেন এবং তা বাস্তবায়ন করতে সহযোগিতাও চান। এ সময় সহযোগিতা করার কথা জানান এমপিরাও। এই বৈঠকেই বিএনপির সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত বা ডিউটি-ফ্রি গাড়ি এবং সরকারি বরাদ্দে কোনো প্লটও না নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে আনার ব্যাপারেও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি সরকারি কোনো গাড়ি ব্যবহার করবেন না। পরিবর্তে নিজের ব্যক্তিগত সাদা রঙের টয়োটা গাড়ি, নিজস্ব চালক এবং নিজের অর্থে কেনা জ্বালানি ব্যবহার করে তিনি যাতায়াত করবেন। রাজধানীর তীব্র যানজট এবং ভিআইপি চলাচলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রটোকল বা গাড়িবহরের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমিয়ে দিয়েছেন। আগে প্রধানমন্ত্রীর বহরে সাধারণত ১৩ থেকে ১৪টি গাড়ি থাকলেও বর্তমানে তা কমিয়ে মাত্র চারটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় রাস্তার দুই পাশে দীর্ঘক্ষণ পোশাকধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকার প্রচলিত নিয়মটিও তিনি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তথ্য মতে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান অথবা বিদেশী মেহমানদের সফর ছাড়া দৈনন্দিন চলাচলের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তাঁর গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন না বলে জানিয়েছেন। এছাড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকগুলো এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিবর্তে সচিবালয়ে হবে। এর ফলে মন্ত্রীদের যাতায়াতের কারণে তৈরি হওয়া যানজট ও জনভোগান্তি অনেক কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নির্দেশনা
বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও খাল খনন—নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা স্বল্প সময়ের মধ্যে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ শুরু করেছে সরকার।
গত বুধবার সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ সাকি জানান, সরকার ১৮০ দিনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি রমজানে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং গণমাধ্যম কমিশন নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল শনিবার তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গেইটে তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইমাম মুয়াজ্জিনদের সম্মানি ভাতা দিবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। তবে এই সম্মানি কত টাকা তা এখনও নির্ধারণ করেনি সরকার। ঈদের আগেই কয়েকটি এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু করবে বলে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত অনলাইন ও অফলাইনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে।
নোয়াখালী-৪ আসনে থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান এনপিবি নিউজকে বলেন, তারেক রহমান যে ভূমিকাগুলো নিচ্ছেন, যেভাবে কাজকর্ম করছেন এসব বিষয় দেশের মানুষ খুবই ভালোভাবে দেখছে। আমাদের উচিত সকল ক্ষেত্রে তারেক রহমানকে সহযোগিতা করা, তাকে সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব। তারেক রহমান আমাদের দলের প্রধান, তার আকাঙ্ক্ষা জনগণের আকাঙ্ক্ষা এক। এজন্যই সকলে মিলে তাকে সহযোগিতা করা উচিত।
তিনি বলেন, দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ থাকলেও তারেক রহমানকে নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তারেক রহমান নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের সহযোগিতার মাধ্যমে তার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে। তারেক রহমান দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করে। দেশের মানুষের কল্যাণের জন্যই যেসকল পদক্ষেপ নেয়া দরকার তিনি তাই করবেন।
ঢাকা-১ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক এনপিবি নিউজকে বলেন, তারেক রহমান শপথ গ্রহণ করার পর থেকে যে সকল ভূমিকা রাখছেন তা দেশের রাজনীতির নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ভিআইপি প্রটোকল ছাড়া সাধারণ মানুষের সাথে গিয়েছেন। তিনি যে সকল ভূমিকা রাখছেন তাকে সহযোগিতা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, প্রতিটা মানুষ জবাব দিয়ে তার মধ্যে আসা উচিত। সুযোগ সুবিধা পেয়ে নিয়ে নেব এটা উচিত নয়। সরকার দুর্নীতি না করলে আমরাও দুর্নীতি করার সুযোগ পাবো না। যে কোনো প্রকারে আমরা দুর্নীতিমুক্ত, উন্নত বাংলাদেশ গড়তে তাকে সহযোগিতা করব। দেশে একটি পরিবর্তন আসা উচিত, সেই পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাবে বিএনপি সরকার।
মন্তব্য করুন