বুধবার
১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

স্বামী এমপি প্রার্থী, স্ত্রী নির্বাচন পর্যবেক্ষক

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও নাসরীন ফাতেমা আউয়াল
expand
আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও নাসরীন ফাতেমা আউয়াল

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি প্রার্থী হয়েছেন স্বামী। স্ত্রী নিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন। স্বামী নির্বাচনী আসন চষে বেড়াবেন আর স্ত্রী করবেন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমূহুর্তে এমনই ঘটনা সামনে এসেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টু। এদিকে তার স্ত্রী নাসরীন ফাতেমা আউয়াল নিয়েছেন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হওয়ার নিবন্ধন।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের বাকি ঠিক এক মাস। এরমধ্যেই প্রধান দুটি দল তাদের জোট নিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছে। বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই জোর প্রচারণা চালাচ্ছে নির্বাচনে জয়ী হতে। নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইতিমধ্যেই। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে স্থানীয় পর্যায়ে ৮১টি সংস্থাকে নিবন্ধন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নিবন্ধিত সংস্থার মধ্যে রয়েছে নাসরীন ফাতেমা আউয়ালের নাম।

নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ঢাকা থেকে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে ৩৩টি সংস্থা। এরমধ্যে উইমেন এন্টারপ্রিনিয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ নিবন্ধন পেয়েছে সর্বশেষ সংস্থা হিসেবে। এ সংস্থাটির চেয়ারপার্সন হিসেবে রয়েছেন নাসরীন আউয়াল মিন্টু। সংস্থাটির কার্যালয় হিসেবে ঢাকার বীর উত্তম সি আর দত্ত রোডের অ্যাংকর টাওয়ারের ঠিকানা দেওয়া রয়েছে।

ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। ২০০১ সালের নির্বাচনে চার দলীয় জোট জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে এই ব্যবসায়ী নেতা বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও জেনারেল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া মাল্টিমোড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই ব্যবসায়ী নেতার স্ত্রী নাসরীন ফাতেমা আউয়াল মিন্টু। নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যার সমাধান, তাদের পণ্যের প্রসার, দক্ষতা বাড়ানোসহ নানা ইতিবাচক ভাবনা থেকে গড়ে তোলেন উইমেনস এন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওয়েব)। এই সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

এমপি প্রার্থীর স্ত্রী নির্বাচনের পর্যবেক্ষক হলে কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তবে বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান তিনি। আনোয়ারুল ইসলাম এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনের পর্যবেক্ষক হতে যে শর্তগুলো পূরণ করতে হয় সেগুলো পূরণ করার মাধ্যমেই আমরা নিবন্ধন দিয়েছি। এমপি প্রার্থীর স্ত্রী পর্যবেক্ষক হতে আইনত কোনো বাধা নেই। কোন প্রার্থী কোথায় নির্বাচন করছেন এবং তার স্ত্রী কেন পর্যবেক্ষক হলেন তা তারাই ভালো বলতে পারবেন।’

তবে বিষয়টিকে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের একজন উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনের পর্যবেক্ষকদের মতামতের উপর ভিত্তি করে নির্বাচনের মানদণ্ড নির্ধারিত হয়। এখানে কোনো প্রার্থীর নিকটাত্মীয় কেউ পর্যবেক্ষক হলেন আবার সে প্রার্থী হেরে গেলেন, তখন তারা যদি নির্বাচনের বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন তবে নির্বাচন বিতর্কিত হবে।’

এ বিষয়ে জানতে উইমেন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর সভাপতি ফাতেমা নাসরীন আউয়ালকে ফোন দেওয়া হলে তার নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একই নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হলে সুবিধা কী এ বিষয়ে বর্তমান নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব:) শাখাওয়াত হোসেন এক কলামে বলেন, ‘আমাদের দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা বেশি দিনের নয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচন থেকেই মূলত পর্যবেক্ষণ শুরু। দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা যেসব সংস্থার রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম ফেমা, ব্রতী, অধিকার, জানিপপ ও ডেমক্রেসিওয়াচ। এ কয়েকটি সংগঠন সার্ক অঞ্চলে ও পূর্ব এশিয়ায়ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। সব কটি সংস্থা এশিয়া ফাউন্ডেশনের ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের তত্ত্বাবধানে ও অর্থায়নে কাজ করেছিল। তাদের সঙ্গে ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনডিআই (বর্তমানে ডিআই), আইআরআই (ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট)। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এসব সংস্থাকে প্রাক্‌–নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। ২০০৭-০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত করা হয়েছিল এশিয়া ফাউন্ডেশনকে।

জাতীয় নির্বাচনে দেশীয় বা স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে বিদেশি সংগঠন থেকেও পর্যবেক্ষক আসেন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিদেশি পর্যবেক্ষকদের তেমন দেখা যায়নি। অতীতে যেসব বিদেশি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে এসেছেন, তাঁরা বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি অর্থায়ন পেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যেসব পর্যবেক্ষক দল ২০০৮ সালের নির্বাচনে এসেছিল, তার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ, আইআরআই, এনডিআই, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টের ‘কার্টার সেন্টার’ ও আনফ্রেল উল্লেখযোগ্য। কোনো কোনো পর্যবেক্ষক দল লম্বা সময়ের জন্য, কোনো কোনো দল আবার স্বল্প সময়ের জন্য এসেছিল। এর পরের দুটি নির্বাচনে দেশের প্রতিষ্ঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো পর্যবেক্ষক দলের তেমন উপস্থিতি ছিল না। কারণ, এসব সংস্থার প্রাক্‌–পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ইতিবাচক ছিল না। তবে স্থানীয় দূতাবাসের স্থানীয় কর্মকর্তারা এবং সার্ক থেকে বিশেষভাবে কমিশনের আমন্ত্রণে কিছু কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। আগামী নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগদানে ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কিছু সংগঠন ইতিমধ্যে প্রাক্‌–নির্বাচন সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। পরিবেশ পর্যবেক্ষণের পর দূতাবাসের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা হয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

২০১৮ সালে দুটি প্রতিষ্ঠিত সংগঠন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রাথমিকভাবে সম্মত হলেও নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে তারা অপারগতা জানিয়েছিল। তবে সার্ক দেশগুলোর কয়েকজন পর্যবেক্ষক হিসেবে এসেছিলেন। একইভাবে বেশ কিছু স্থানীয় সংগঠনকে পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে এমন একটি সংগঠনও ছিল, যেটিতে কয়েকজন অনভিজ্ঞ বিদেশি ব্যক্তিকে যুক্ত করা হয়েছিল। তাঁদের ভূমিকাও ছিল বিতর্কিত।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X