

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


একটি পরীক্ষার জিপিএ কখনোই একটি তরুণের জীবনের শেষ কথা হতে পারে না, অথচ প্রতিবছর মাধ্যমিক ও সমমানের ফলাফল প্রকাশের দিনটি দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। ফলাফল প্রকাশের সাথে সাথেই শুরু হয় অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা, নম্বরের তুলনা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আমাদের সমাজ ও পরিবারগুলো আজ শিক্ষাকে কেবল সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনের দৌড় বানিয়ে ফেলেছে। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে কোনো খোঁজ না নিয়েই শিক্ষার্থীকে এক অদৃশ্য সামাজিক নির্যাতনের শিকার করা হয়।
তাকে অপরাধী ভাবার এই প্রবণতা, তীব্র অপমান ও গ্লানি অনেককে আত্মহননের মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়- যা আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করায়: একটি পরীক্ষার জিপিএ কি একটি মানবজীবনের চেয়েও মূল্যবান?
বাস্তবতা হলো, মাধ্যমিক পরীক্ষা জীবনের একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র, কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। জিপিএ ৫ না পেয়েও কেবল অধ্যবসায় ও চেষ্টার জোরে জীবনে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন, এমন মানুষের উদাহরণ আমাদের চারপাশে অগণিত।
সর্বোচ্চ নম্বরের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও নৈতিক গঠনে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। মুখস্থবিদ্যার জোরে রেজাল্ট ভালো করার চেয়ে একজন সংবেদনশীল, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই মানসিক সংকট থেকে বের হতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে:
পরিবারের ভূমিকা: সন্তানকে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার না করে তার মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। ফলাফল যা-ই হোক, পরিবারকে হতে হবে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
অকৃতকার্য বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া সন্তানকে ধিক্কার না দিয়ে সাহস জোগাতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে ব্যর্থতাই শেষ কথা নয়।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: প্রতিবেশীদের আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাফলের তুলনা বন্ধ করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থীর একটি সাময়িক ব্যর্থতা তার পুরো জীবনের সম্ভাবনার শেষ নয়- সমাজকে এই সংবেদনশীলতা ধারণ করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার: শিক্ষা বোর্ডগুলোকে মূল্যায়ন পদ্ধতি আরও চাপমুক্ত ও যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক মেধা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতার মূল্যায়ন প্রাধান্য পায়।
একটি জাতির প্রকৃত সাফল্য লুকিয়ে থাকে তার তরুণ প্রজন্মের মানসিক নিরাপত্তা ও মানবিক বিকাশের মধ্যে, কেবল পরীক্ষার নম্বরের খাতায় নয়।
প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন বিষণ্নতায় না ভুগে নিজের দক্ষতা নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।