

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


নতুন বাসায় ওঠার পর কিংবা নতুন ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়ার সময় আমরা সাধারণত টেকনিশিয়ানের রেখে দেওয়া বা সুবিধাজনক মনে হওয়া যেকোনো স্থানেই রাউটারটি রেখে দিই।
অনেক ক্ষেত্রেই সচেতনতার অভাবে রাউটারটি রান্নাঘরের তাকে, ঘরের কোনো এক কোণে কিংবা মেঝেতে অবহেলায় পড়ে থাকে।
এর ফলে পরবর্তীতে ইন্টারনেটের ধীরগতি, ভিডিও কলে ল্যাগ কিংবা ঘরের সব অংশে সিগন্যাল না পাওয়ার মতো সমস্যায় পড়তে হয়।
ব্যবহারকারীরা অনেক সময় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (ISP) ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন কিংবা ডিভাইস রিস্টার্ট দিতে থাকেন, অথচ আসল সমস্যাটি লুকিয়ে থাকে রাউটারের ভুল অবস্থানে।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, ওয়াই-ফাইয়ের গতি ও কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে রাউটারটি ঘরের কোথায় স্থাপন করা হচ্ছে তার ওপর।
রাউটার যত উন্নত প্রযুক্তিরই হোক না কেন, সঠিক অবস্থানে না থাকলে তার ক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই নষ্ট হয়ে যায়।
হার্ডওয়্যার যাচাই
রাউটারের অবস্থান নির্ধারণের আগে আপনার ডিভাইসটি বর্তমান সময়ের উপযোগী কি না তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের অধিকাংশ ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট সাধারণত ১৫০০ বর্গফুটের নিচে হয়ে থাকে।
এই আকারের ঘরের জন্য একটি ভালো মানের রাউটার বা ওয়্যারলেস অ্যাকসেস পয়েন্টই যথেষ্ট।
তবে রাউটারটি যদি অনেক পুরোনো মডেলের হয়, তবে সেটি পরিবর্তন করে আধুনিক 802.11ac এবং ডুয়াল-ব্যান্ড (Dual-Band) সমর্থিত রাউটার ব্যবহার করা উচিত।
এটি কভারেজ ও গতি সংক্রান্ত জটিলতা বহুলাংশে কমিয়ে দেয়।
বড় বাড়ি বা বহুতল ভবন:
আপনার বাড়ি যদি অনেক বড় হয় কিংবা একাধিক তলায় ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন পড়ে, তবে একটি মাত্র রাউটার পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।
সেক্ষেত্রে 'মেশ নেটওয়ার্ক' (Mesh Network) তৈরি করতে হবে অথবা মূল রাউটারের সাথে ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডার (Wi-Fi Extender) ব্যবহার করে সিগন্যাল সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে।
সর্বোচ্চ সিগন্যালের জন্য রাউটার স্থাপনের নিয়ম
ক) ঘর বা অ্যাপার্টমেন্টের কেন্দ্রস্থল বেছে নিন: রাউটার তার চারপাশের সব দিকে সমভাবে সিগন্যাল তরঙ্গ ছড়ায়। তাই রাউটারটিকে যদি ঘরের কোনো এক কোণে বা একদিকের ঘরে স্থাপন করা হয়, তবে তার সিগন্যালের একটি বড় অংশ (প্রায় অর্ধেক কভারেজ) দেয়াল ভেদ করে বাইরে বা পাশের বাসায় চলে যায়।
এতে একদিকে যেমন নিজের ঘরে কভারেজ কমে যায়, অন্যদিকে পাশের বাসায় সিগন্যাল পৌঁছানোর কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পুরো বাড়িতে সমান হারে কভারেজ পেতে রাউটারটি সর্বদা ঘরের মাঝামাঝি বা কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করুন।
ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়ার সময়েই লম্বা ইথারনেট কেবল ও পাওয়ার আউটলেটের ব্যবস্থা করে মাঝামাঝি স্থানে রাউটার বসানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
খ) রাউটার যত উঁচুতে, তত ভালো কাভারেজ: ওয়াই-ফাই সিগন্যাল বা রেডিও তরঙ্গ সাধারণত নিচের দিকে বেশি পরিভ্রমণ করে। তাই রাউটার মেঝেতে বা নিচু কোনো স্থানে রাখলে সিগন্যাল আসবাবপত্র দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
রাউটারকে বুকশেলফ বা আলমারির ওপর অথবা দেয়ালে মাউন্ট করে চোখের উচ্চতা বা তার চেয়ে উঁচুতে রাখা উচিত। অনলাইনে বা বাজারে সহজেই বিভিন্ন ধরণের রাউটার ওয়াল মাউন্ট পাওয়া যায়, যা দিয়ে সহজেই একে দেয়ালে আটকে দেওয়া সম্ভব।
গ) অ্যান্টেনার সঠিক বিন্যাস: আধুনিক রাউটারগুলোতে এক বা একাধিক (এমনকি ৮টি পর্যন্ত) এক্সটার্নাল অ্যান্টেনা থাকে। এই অ্যান্টেনাগুলো সিগন্যালকে নির্দিষ্ট অভিমুখে পাঠাতে সাহায্য করে।
রাউটারের সব অ্যান্টেনা এক দিকে সোজা করে না রেখে, সেগুলোকে বিভিন্ন অভিমুখে (যেমন- একটি লম্বালম্বি এবং অন্যটি আড়াআড়ি বা বিপরীতমুখী করে) বিন্যস্ত করা উচিত। এতে সব দিকে সিগন্যাল সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
সিগন্যাল প্রতিবন্ধকতা ও ইন্টারফিয়ারেন্স এড়ানো
ওয়াই-ফাই সিগন্যাল বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং গৃহস্থালির সামগ্রী দ্বারা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। নিচে প্রধান প্রতিবন্ধকগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো, যা থেকে রাউটারকে দূরে রাখা জরুরি:
মাইক্রোওয়েভ ওভেন: এটি সাধারণত ২.৪ গিগাহার্টজ তরঙ্গে কাজ করে, যা রাউটারের সিগন্যালের ফ্রিকোয়েন্সির সাথে সরাসরি সংঘর্ষ (Interference) তৈরি করে গতি কমিয়ে দেয়।
বড় টেলিভিশন (TV): টিভির ভেতরের ধাতব অংশ ও ইলেকট্রনিক্স উপাদান ওয়াই-ফাই সিগন্যালকে সরাসরি বাধা প্রদান করে।
ধাতব বস্তু ও আসবাব: লোহা, স্টিল বা যেকোনো ধাতব বস্তু সিগন্যাল শোষণ করে অথবা প্রতিফলিত করে চারদিকে বিঘ্ন ঘটায়।
অ্যাকুরিয়াম ও পানি: পানি ওয়াই-ফাই তরঙ্গের জন্য অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। রাউটার ও ডিভাইসের মাঝে পানি বা অ্যাকুরিয়াম থাকলে সিগন্যাল চরমভাবে হ্রাস পায়।
ব্যবহারিক পরামর্শ
ইন্টারনেট টেকনিশিয়ানরা সাধারণত কেবল সংযোগ দেওয়ার সুবিধার্থে ঘরের প্রবেশমুখের কাছাকাছি রাউটার রেখে চলে যান। কিন্তু সংযোগ দেওয়াই তাদের কাজ, আপনার কাজের সুবিধা ও সর্বোচ্চ গতির জন্য উপযুক্ত স্থানটি আপনাকেই ভেবে নির্ধারণ করতে হবে।
রাউটারটি সঠিক স্থানে স্থাপনের পর আপনার স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ নিয়ে ঘরের প্রতিটি কোণে গিয়ে সিগন্যালের শক্তি পরীক্ষা (Network Strength Check) করে নিন।
যেখানে সিগন্যাল দুর্বল মনে হবে, সেই অনুযায়ী রাউটারের অবস্থান বা অ্যান্টেনা সামান্য পরিবর্তন করে নিন। সামান্য এই সচেতনতা আপনাকে দিতে পারে নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা।
