রবিবার
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এআইয়ের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে মানবসভ্যতা?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আলোচনায় এত দিন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে এর সম্ভাবনার দিক। কিন্তু এআই যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, ততই সামনে আসছে অন্য একটি প্রশ্ন: এই প্রযুক্তি যদি মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রস্তুতি কি বিশ্বের আছে?

পশ্চিমা বিশ্বের বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই প্রশ্নই গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ‘আর্টিফিশিয়াল সুপারইন্টেলিজেন্স’ (এএসআই) নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এটি এমন একটি সম্ভাব্য এআই ব্যবস্থা, যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত হতে পারে।

কয়েকজন গবেষক আশঙ্কা করছেন, অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্রের মতো প্রচলিত ঝুঁকির চেয়েও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এমনকি কিছু বিশেষজ্ঞ আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনাও উল্লেখ করেছেন।

তবে এ আশঙ্কার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—প্রযুক্তির উন্নতির তুলনায় এর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো অনেক পিছিয়ে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের এক আলোচনায় কম্পিউটার বিজ্ঞানী অধ্যাপক স্টুয়ার্ট রাসেল বলেন, ভবিষ্যতে এআই থেকে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে মানুষ উন্নত এআই ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেস ব্রাউনও এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই মানবজাতির জন্য পারমাণবিক যুদ্ধের চেয়েও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

‘কন্ট্রোল এআই’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে এই আলোচনা হয়। সংগঠনটি সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটির সমর্থকদের মধ্যে স্কাইপের সহপ্রতিষ্ঠাতা জান তালিনও রয়েছেন।

লেবার পার্টির এমপি অ্যালেক্স সোবেলের প্রস্তাবিত একটি বিলও সংগঠনটি সমর্থন করছে। বিলটির অন্যতম উদ্দেশ্য সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। একই দলের এমপি ড্যারেন জোন্স এআই নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

তার যুক্তি, এআইয়ের ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত কতটা ভয়াবহ হবে, সেটি নিয়ে বিতর্ক করতে করতে সময় পার করার সুযোগ নেই। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক শুধু রাজনীতিবিদ বা বাইরের গবেষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর থেকেও উদ্বেগের কথা শোনা যাচ্ছে।

অ্যানথ্রোপিকের গবেষক জেকুব কক্সন সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির চাকরি ছেড়েছেন। তার অভিযোগ, আরও শক্তিশালী এআই মডেল তৈরির প্রতিযোগিতায় কোম্পানিগুলো দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

অ্যানথ্রোপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের প্রধান ইভান হাবিংগারও এআইয়ের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, আগামী ১০ বছরে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি হতে পারে।

এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো উন্নত মডেলের পরীক্ষার বিষয়টি। যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষার জন্য অ্যানথ্রোপিক তাদের নতুন মডেল ‘মিথোস ৫.১’ জমা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ ধরনের ঘটনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—উন্নত এআই মডেল তৈরির আগে এবং পরে সেগুলোর ঝুঁকি যাচাই করবে কে?

কারণ, একটি শক্তিশালী এআই মডেল বাজারে আসার পর তার সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকানোর চেয়ে তৈরির আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে। এ কারণেই এআই নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য অভিন্ন আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরির দাবি জোরালো হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও এআই শিল্পের ওপর সরকারি নজরদারি বাড়ানোর দাবি রয়েছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স কংগ্রেসকে এআই শিল্প নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অল্প কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে এমন একটি শক্তিশালী প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা থাকা উচিত নয়, যার প্রভাব পুরো মানবসমাজের ওপর পড়তে পারে।

একটি জরিপে ৮১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এআইয়ের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বলে দাবি করা হয়েছে। এ তথ্যও এআই নিয়ন্ত্রণের পক্ষে রাজনৈতিক চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এআই নিয়ে যে সব বিশেষজ্ঞই মানবসভ্যতার অস্তিত্ব সংকটের আশঙ্কা করছেন, তা নয়। সারে ইনস্টিটিউটের ড. অ্যান্ড্রিউ রগোইস্কির মতে, অত্যন্ত উন্নত এআই বাস্তবে হয়তো প্রত্যাশার মতো সহজে কার্যকর হবে না। এর জন্য বিপুল অর্থ ও অবকাঠামোর প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তব প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

অধ্যাপক ডেভিড বার্বারও এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, কিন্তু একই সঙ্গে এআই যে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী প্রযুক্তি হয়ে উঠছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক স্যান্ড্রা ওয়াখটার আরও একটি বিষয় সামনে এনেছেন। তার মতে, ‘টার্মিনেটর’-ধাঁচের ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা করলে বর্তমানের বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে পরিবর্তন, ভুল তথ্যের বিস্তার এবং ডেটা সেন্টারের কারণে পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ—এসব সমস্যা ইতিমধ্যেই বাস্তব।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank