বৃহস্পতিবার
২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ঢাকার বাইরের যে ৫ জেলা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ জুলাই মাস থেকেই বাড়ছে। চলতি আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই জুলাইয়ের তুলনায় বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চলতি মাসে প্রায় ১১ হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০০-এর বেশি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি মানুষ। এ সময়ে মারা গেছেন ৭৬ জন। রাজধানী ঢাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও এবার ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে খুলনা, চট্টগ্রাম, পিরোজপুর, ময়মনসিংহ ও গাজীপুরে।

খুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি

ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে খুলনা জেলা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জেলাটিতে এক হাজার ৬০০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মৃত্যুর দিক থেকেও দেশের জেলাগুলোর মধ্যে খুলনা এগিয়ে। সেখানে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৪ জন।

এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৩৯১ জন। মারা গেছেন তিনজন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পিরোজপুর। জেলাটিতে এ বছর এক হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এ রোগে মারা গেছেন একজন। আক্রান্তের সংখ্যায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯২৪ জন। মারা গেছেন ছয়জন।

ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর সেখানে ৭২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত জেলাটিতে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি।

কেন ঝুঁকিতে এসব জেলা

জনস্বাস্থ্য ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে বলেন, এ বছর উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে।

এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা এবং বছরজুড়ে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। কোনো পাত্র বা স্থানে ৪৮ ঘণ্টার বেশি পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়তে ও লার্ভা তৈরি করতে পারে।

তার মতে, সংরক্ষিত পানিতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করলে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব। তবে কিছু এলাকায় এ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হলেও সব লবণাক্ত এলাকায় একইভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়নি।

গাজীপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপের পেছনে ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন ডা. মুশতাক। নিম্ন আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে ব্যক্তিগতভাবে সব জায়গার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবেশের মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ময়মনসিংহেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার মতো বিষয় ডেঙ্গু সংক্রমণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রামেও বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহাড় রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। ডেঙ্গু আক্রান্তের দিক থেকে এবার চট্টগ্রাম জেলা রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গাছপালাযুক্ত এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। তবে শুধু পাহাড়ি এলাকা নয়, ঘনবসতিও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ানোর বড় কারণ।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকা জনবিরল হলে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু সেখানে ঘনবসতি তৈরি হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও ঢাকার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই।’

কীটতত্ত্ববিদ ও জাতীয় নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি যেসব অঞ্চলের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি, সেসব এলাকাতেও ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় মানুষ অনেক সময় নিরাপদ নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে পানি রাখলে ওই পাত্রগুলো এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।’

শুধু শহর নয়, গ্রামেও এডিস

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এডিস ইজিপ্টাই মূলত শহরকেন্দ্রিক মশা। আর এডিস এলবোপিকটাস বেশি দেখা যায় গাছপালা থাকা গ্রামীণ এলাকায়। ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টাই হলেও কোনো কোনো এলাকায় এডিস এলবোপিকটাসও গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।

হাঁড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, দইয়ের পাত্রসহ বিভিন্ন কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস ইজিপ্টাই বংশবিস্তার করে। অন্যদিকে গাছের কোটর বা কচুপাতার গোড়ার মতো প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে থাকা জায়গায় এডিস এলবোপিকটাসের প্রজনন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব মূলত শহরাঞ্চলে বেশি দেখা গেলেও নগরায়নের প্রভাবে এখন গ্রামেও এর বিস্তার ঘটেছে। গ্রামেও এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

মনজুর আহমেদ চৌধুরীর বলেন, ‘মানুষের আয় ও ভোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের পাত্রের ব্যবহারও বেড়েছে। ছাদবাগানসহ বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক শহর ও গ্রামের পার্থক্য কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ডেঙ্গুবাহী মশার জন্য নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।’

আবহাওয়া ও মশা নিয়ন্ত্রণেও ঘাটতি

সারাদেশে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার পেছনে আবহাওয়া এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ঘাটতিকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। এতে এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোয় জনপ্রতিনিধি না থাকায় গত প্রায় দুই বছর ধরে সিটি করপোরেশন ও উপজেলাগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়নি। এর প্রভাবেও মশার সংখ্যা বেড়েছে।’

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু যেভাবে

বাংলাদেশে ঠিক কখন থেকে এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। ১৯৯৮ সালে কিছু রোগীর দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরের বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে অনেক রোগীর দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু পাওয়া যায়। ২০০০ সালের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে শুরু করে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বড় আকার ধারণ করে। ওই বছর এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং মারা যান ১৭৯ জন।

তবে ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা যায়। ওই বছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

এবারের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ডেঙ্গু আর শুধু রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক থাকছে না। উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ও গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়ায় সংক্রমণের বিস্তার নতুন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank