

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


পরিবার ও সমাজের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে জড়ানোটাকে আমাদের চারপাশে খুব স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই দেখা হয়। তবে কেউ যখন এই চেনা ছকের বাইরে গিয়ে বিয়ের প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলেন বা নিজেকে বিয়ের অনুপযুক্ত ভাবেন, তখন সমাজ তাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বা ‘কমিটমেন্টে দুর্বল’ বলে ধরে নেয়।
কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, এই অনিচ্ছার গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারে ‘গ্যামোফোবিয়া’ (Gamophobia) নামের এক তীব্র মানসিক ভীতি। এটি শুধু সাধারণ কোনো অনীহা বা জড়তা নয়, বরং বিয়ের কথা চিন্তা করলেই আক্রান্ত ব্যক্তির মনে তীব্র আতঙ্ক, মানসিক চাপ ও চরম অস্বস্তি তৈরি হতে থাকে। সম্পর্কের স্থায়িত্ব, স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা কিংবা অতীতের কোনো বাজে অভিজ্ঞতা থেকে এই ভয়ের জন্ম হতে পারে, যা মানুষকে একটি সুস্থ সম্পর্কে জড়াতে মানসিকভাবে বাধা দেয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিয়ের প্রতি এই চরম ভীতি হুট করে আসে না, বরং এর পেছনে কাজ করে অতীত জীবনের কোনো গভীর মানসিক ক্ষত। শৈশবে যারা বাবা-মায়ের অনবরত কলহ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা তিক্ত বিচ্ছেদ খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের মনে বিয়ে নিয়ে চরম নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে যায়। তারা বড় হয়েও বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে বৈবাহিক বন্ধন মানেই অশান্তি আর ব্যক্তি-স্বাধীনতার অবসান।
এছাড়া, প্রাপ্তবয়সে ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া বড় কোনো প্রতারণা, তিক্ত ব্রেকআপ বা মানসিক আঘাতও মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। বিশেষ করে যাদের মধ্যে একা হয়ে যাওয়ার ভয় (অ্যাবাডনমেন্ট ইস্যুজ) কিংবা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা 'অ্যাটাচমেন্ট অ্যানজাইটি' কাজ করে, তারা কাউকেই সহজে বিশ্বাস করতে পারেন না। ফলস্বরূপ, যেকোনো স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কে জড়ানোর চিন্তাই তাদের কাছে এক ধরণের মানসিক ঝুঁকির মতো মনে হয়।
শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা
পারিবারিক বা মানসিক ক্ষতের পাশাপাশি আধুনিক জীবনযাত্রা এবং বদলে যাওয়া সামাজিক প্রেক্ষাপটও বিয়ে নিয়ে এই ভীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে নিজের ক্যারিয়ার, আর্থিক স্বাবলম্বিতা, ব্যক্তিগত সময় এবং স্বাধীনতা অত্যন্ত মূল্যবান। ফলে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা এমন শঙ্কার মুখোমুখি হন, যেখানে বিয়ে মানেই সমঝোতা কিংবা নিজের ডানা ছেঁটে ফেলা বলে মনে করা হয়।
আবার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত ভেসে আসা বৈবাহিক জীবনের তিক্ততা, পরকীয়া, বিষাক্ত সম্পর্ক কিংবা বিবাহবিচ্ছেদের নেতিবাচক গল্পগুলো তরুণদের মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। চারপাশের এই নেতিবাচক কনটেন্ট ও বাস্তবতার ঘনঘটা, মানুষের মনে ঘর বাঁধার স্বপ্নকে ভেঙে এক ধরণের অবিশ্বাস, ও তীব্র ফোবিয়ায় রূপ দিচ্ছে। গ্যামোফোবিয়ার পেছনে বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও এক বিরাট কারণ হিসেবে কাজ করছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অভাব তরুণ সমাজকে এক ধরণের তীব্র সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়।
বিশেষ করে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিয়ে মানে কেবল দুটি মনের মিলন নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে থাকে বিশাল অংকের সামাজিক ও পারিবারিক আর্থিক গুরুভার। এই বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার ভয়ে অনেকেই বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যান।
তবে মনোবিজ্ঞানীদের মতে, জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ভয় থাকাটা কোনো অস্বাভাবিক মানসিক বিকৃতি নয়। কিন্তু এই ভীতি যখন কারও দৈনন্দিন জীবনকে অস্থির করে দেয়, নিঃসঙ্গতা বাড়ায় কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন একে অবহেলা করা ঠিক হবে না।
এই বৃত্ত থেকে বের হতে নিজের ভেতরের ভয়টাকে চেনা, কাছের মানুষের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা এবং প্রয়োজনে পেশাদার থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত জরুরি- যা জীবনের এই ভয়কে কাটিয়ে নতুন করে পথ চলতে সাহায্য করতে পারে।
