

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বিশ্বকাপ ফুটবলে দুর্দান্ত সাফল্যের পর আবারও সংবাদের শিরোনামে এসেছে স্পেন। তবে শুধুমাত্র ফুটবল মাঠেই নয়, অনন্য জীবনযাপন, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতির কারণে বিশ্বমঞ্চে দেশটি সবসময়ই বেশ আলাদা।
১. ‘সিয়েস্তা’ বা মধ্যাহ্ন বিরতির ঐতিহ্য
স্পেনে প্রথমবার ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরা একটি বিষয় দেখে বেশ অবাক হন- দুপুর গড়ালেই হঠাৎ সব দোকানপাট, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
দেখলে মনে হবে পুরো শহর যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে! আসলে এটি কোনো ধর্মঘট নয়, বরং স্পেনের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মধ্যাহ্ন বিরতির সংস্কৃতি, যাকে বলা হয় ‘সিয়েস্তা’ (Siesta)।
সাধারণত দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছোট দোকান ও পারিবারিক ব্যবসা বন্ধ থাকে। কর্মীরা এ সময় বাড়ি ফিরে খাবার খান ও বিশ্রাম নেন। সন্ধ্যা হলে দোকানপাট আবার খুলে রাত পর্যন্ত কেনাবেচা চলে।
তীব্র গ্রীষ্মে এয়ার কন্ডিশনার ছাড়া কাজ করা কঠিন ছিল বলে দুপুরে বিরতি নেওয়ার এই প্রচলন শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
বড় শহর (যেমন: মাদ্রিদ, বার্সেলোনা) কিংবা শপিংমলগুলো এখন সারাদিন খোলা থাকলেও ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে এখনো সিয়েস্তার নিয়ম বেশ মানা হয়।
২. নৈশভোজের বিলম্বিত সময়
স্প্যানিশদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো অনেক দেরিতে রাতের খাবার খাওয়া। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে রাত ৭টার মধ্যে নৈশভোজ শেষ হয়, সেখানে স্পেনে রাত ৯টা থেকে ১০টা, এমনকি গ্রীষ্মকালে রাত ১১টায় রাতের খাবার খাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। দুপুরে ‘সিয়েস্তা’র দীর্ঘ বিরতির কারণে কর্মদিবস লম্বা হয়, ফলে নৈশভোজের সময়ও স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে যায়।
৩. রঙিন উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি
স্পেনের বেশ কিছু উৎসব ও রীতিনীতি বিশ্বজুড়ে রোমাঞ্চ ও কৌতুহল তৈরি করে:
১২টি আঙুর খাওয়ার রীতি: নতুন বছরের মধ্যরাতে ঘড়ির ১২টি ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে ১২টি আঙুর খাওয়ার প্রথা রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এতে বছরের ১২টি মাসই সৌভাগ্য বয়ে আনে।
লা টোমাটিনা (La Tomatina): এটি স্পেনের বিখ্যাত ‘টমেটো যুদ্ধ’ উৎসব। হাজার হাজার মানুষ শত শত টন পাকা টমেটো একে অপরের দিকে ছুড়ে আনন্দ করেন। এটি দেখতে বহু বিদেশী পর্যটক ভিড় জমান।
ষাঁড়ের সঙ্গে দৌড় (Running of the Bulls): এই উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা খোলা রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া ষাঁড়ের সামনে দৌড়ান। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণীকল্যাণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি শতাব্দী প্রাচীন সংস্কৃতির অংশ।
৪. পারিবারিক বন্ধন ও ফুটবলের আবেগ
স্পেনীয় সমাজে পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যস্ত সপ্তাহের শেষে পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো, আড্ডা দেওয়া এবং একসঙ্গে খাওয়াকে তারা জীবনযাত্রার আবশ্যক অংশ মনে করেন।
অন্যদিকে, ফুটবল স্পেনে শুধুই একটি খেলা নয়, বরং জাতীয় পরিচয়ের অংশ। তৃণমূল পর্যায় থেকে শিশুদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফলেই দেশটি বারবার বিশ্বমানের ফুটবলার উপহার দিতে পারছে।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দারুণ স্পর্শ
আজকের স্পেন একদিকে যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বুলেট ট্রেনের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে ইউরোপের অন্যতম সেরা দেশ।
অন্যদিকে ‘সিয়েস্তা’ বা ‘লা টোমাটিনা’র মতো শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যকেও সমানভাবে লালন করে চলেছে। তাই স্পেনে গিয়ে দুপুরে দোকানপাট বন্ধ দেখলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই- এটি স্প্যানিশ জীবনধারারই এক অনবদ্য রূপ!