

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের আর মাত্র ৭ দিন বাকি। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে হবিগঞ্জ জেলার ৪টি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী পরিস্থিতি।
প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের গণসংযোগ, প্রচারণা ও ভোটের হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে প্রশাসনের দুশ্চিন্তা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেলার মোট ৬৪৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৩টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৩২টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব কেন্দ্রকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলার ৪টি সংসদীয় আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬২ জন।
এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ২৮ হাজার ৬৯৬ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ৫ হাজার ২৪২ জন এবং হিজড়া ভোটার ২৪ জন।
এবারের নির্বাচনে নতুন করে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ২১৭ জন, যা ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিষয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াছমিন খাতুন জানান, পূর্ববর্তী নির্বাচনে সহিংসতার ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, যাতায়াত সমস্যা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে কোন কোন কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ, তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, এসব কেন্দ্রে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। এবার প্রথমবারের মতো প্রিসাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা এবং পুলিশের বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে।
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে হবিগঞ্জ জেলায় নিয়োজিত থাকবেন ২ হাজার ৪৭ জন পুলিশ সদস্য, দুটি কুইক রেসপন্স টিম, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা। ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি আসনের জন্য আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা নির্বাচন অফিস।
প্রার্থী ও আসনভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণেও এবার রয়েছে নানা মাত্রা। জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত চারটি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২৪ জন প্রার্থী।
এরমধ্যে ২০ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে দুজন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দলীয় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হবিগঞ্জ-১ নবীগঞ্জ-বাহুবল আসনে বিএনপি প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়ার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া। দুজনেরই নিজস্ব ভোট ব্যাংক থাকায় দলীয় বিভক্তি ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মিরপুরীও ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
হবিগঞ্জ-২ বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ আসনে বিএনপি প্রার্থী ও সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবনের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ।
ধর্মীয় ভোট এবং দলীয় সমর্থনের হিসাব এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সাংবাদিক আফসার আহমেদ রূপক।
হবিগঞ্জ-৩ হবিগঞ্জ সদর-লাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তাঁর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামের কাজী মহসিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলনের মহিব উদ্দিন আহমেদ সোহেল এবং সুন্নী জোটের প্রার্থী ডা. এস এম সরোয়ার মাঠে রয়েছেন।
ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও নতুন করে গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট আশরাফুল বারী নোমানের জামাতে যোগদান ভোটের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হবিগঞ্জ-৪ চুনারুঘাট-মাধবপুর আসনে রয়েছে ২৪টি চা বাগান। ঐতিহাসিকভাবে চা শ্রমিকদের ভোটই এখানে জয়-পরাজয়ের মূল নিয়ামক।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী এস এম ফয়সল, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হচ্ছে। এখানে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ও সাধারণ ভোটারদের মতামত বিশ্লেষণে চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থী, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব এবং নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে চারটি আসনেই বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল পালাক্রমে জয়লাভ করেছে। অতীত ইতিহাস ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ঘিরে জেলার চারটি আসনেই কৌতূহল তুঙ্গে।
সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রার্থী সমীকরণ, বিদ্রোহী প্রভাব ও নতুন ভোটারদের উপস্থিতিতে হবিগঞ্জের নির্বাচনী মাঠ শেষ মুহূর্তে এসে জমে উঠেছে। চূড়ান্ত সব হিসাব-নিকাশের উত্তর মিলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, ব্যালট বাক্স খোলার পরই।
মন্তব্য করুন
