বুধবার
০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নোবিপ্রবির শহীদ মিনার: স্মৃতির বেদি থেকে প্রতিবাদের মঞ্চ

কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম
নোবিপ্রবির শহীদ মিনার।
expand
নোবিপ্রবির শহীদ মিনার।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পেরোলেই চোখে পড়ে শুভ্র স্তম্ভ আর মাথায় উজ্জ্বল লাল বৃত্ত। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রহরী। যে পাহারা দিচ্ছে ইতিহাস, স্মৃতি আর প্রতিজ্ঞাকে। এটি নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

এই মিনার কেবল ইট-সিমেন্টের স্থাপনা নয়। এটি একটি চেতনার নাম। ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা এবং সমকালীন শিক্ষার্থী আন্দোলনের সম্মিলিত কণ্ঠ, সবকিছুর মিলিত প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি।

২০১৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। মূল বেদি থেকে ২৬ ফুট উচ্চতার এই স্থাপত্য বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরকে শুধু নান্দনিকতাই দেয়নি, দিয়েছে এক অনাড়ম্বর গাম্ভীর্য।

দিনের আলোয় সাদা স্তম্ভগুলো স্পষ্ট ও দৃঢ়। আর রাত নামলে আলোকসজ্জায় লাল বৃত্তটি যেন অন্ধকার ভেদ করে ওঠা এক সূর্য। শিক্ষার্থীদের অনেকে বলেন, “রাতে ক্যাম্পাসে হাঁটলে শহীদ মিনারের দিকে তাকালেই মনে হয় - আলো এখনো নিভে যায়নি।

২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর। জাতীয় দিবসগুলোতে এই প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে ফুলে, স্লোগানে আর গানে। প্রভাতফেরির সুরে ক্যাম্পাস জেগে ওঠে, আর শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

তবে শহীদ মিনারের প্রাণচাঞ্চল্য কেবল নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ নয়। বিকেলের আড্ডা, ছবি তোলা, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা নীরব বসে থাকা—সবকিছুরই কেন্দ্র এই স্থান। নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে এটি পরিচয়ের প্রথম ঠিকানা; পুরোনোদের কাছে স্মৃতির স্থায়ী ফ্রেম।

নোবিপ্রবির শহীদ মিনার শুধু স্মৃতির নয়, প্রতিবাদেরও ঠিকানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীর, কর্মকর্তা- কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মানববন্ধন, শিক্ষকদের প্রতিবাদ কর্মসূচি—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিই এই প্রাঙ্গণকে ঘিরে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শিক্ষার্থী আন্দোলন এখান থেকেই সংগঠিত হয়। দাবি-দাওয়ার ভাষা, ঐক্যের শপথ, প্রতিবাদের স্লোগান - সব মিলিয়ে শহীদ মিনার চত্বর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস রাজনীতির এক প্রাণকেন্দ্র। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যৌথ অবস্থানও বারবার এই স্থানকেই বেছে নিয়েছে।

শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তৌহিদুর রহমান মিনারকে দেখেন এক ধরনের নৈতিক কম্পাস হিসেবে। তাঁর ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানা মত, দ্বিধা ও বিতর্কের ভিড়ে দাঁড়িয়ে এই মিনার যেন মনে করিয়ে দেয়। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত শক্তি বাহুতে নয়, চিন্তায়; স্লোগানে নয়, যুক্তিতে। কলম, জ্ঞান ও সমালোচনামূলক বোধ - এই তিনটিই তাকে আলাদা করে দেয়।

তিনি বলেন, গোলচত্বরের ব্যস্ততা পেরিয়ে কিংবা ভোরের নরম আলোয় যখন শহীদ মিনার চোখে পড়ে, তখন এটি কেবল স্থাপত্য মনে হয় না; বরং এক নীরব শিক্ষক বলে মনে হয়। মাথার লাল বৃত্তটি তাঁর কাছে রক্তের স্মৃতি যেমন, তেমনি উদীয়মান সূর্যেরও প্রতীক—যা অন্ধকারের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তৌহিদের মতে, শহীদদের আত্মত্যাগ কেবল ইতিহাসের অধ্যায় নয়; এটি প্রতিদিনের দায়বদ্ধতা। এই মিনার শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেয়, সত্য উচ্চারণের সাহস হারালে শিক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ে। জ্ঞানের আলোয় আলোকিত মনই পারে অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করতে এবং জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে।

দিনের শেষে যখন ক্যাম্পাস ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখনও সাদা স্তম্ভগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন বলছে—সংগ্রাম থেমে থাকে না, আলো নিভে যায় না। নোবিপ্রবির শহীদ মিনার তাই শুধু অতীতের স্মারক নয়; এটি বর্তমানের প্রেরণা, ভবিষ্যতের প্রতিজ্ঞা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন