সোমবার
০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও শিক্ষক রাজনীতি ফেরাতে তোড়জোড়

কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিলুপ্ত হওয়া শিক্ষক সমিতি আবারও পুনর্গঠনের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা।

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন শিক্ষক সমিতি পুনর্গঠনের জন্য শিক্ষকদের শিক্ষকদের কাছে চিঠি পাঠান।

বিষয়টি সামনে আসার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, শিক্ষক সমিতি তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করা ছাড়া শিক্ষার্থীদের কোনো কল্যাণে আসেনি। এছাড়াও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (কুকসু) নির্বাচনের আগে কোনো শিক্ষক সমিতি চায়না বলেও জানান শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, সর্বশেষ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ শিক্ষক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামীপন্থি নীল প্যানেল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সভাপতি নির্বাচিত হন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের এবং সাধারণ সম্পাদক হন মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী হাসান।

নির্বাচনের দিনই নবনির্বাচিত কমিটি সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে উপাচার্য দপ্তরে হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই শিক্ষক সমিতি ও প্রশাসনের মধ্যে টানাপোড়ন শুরু হয়। সাত দফা দাবিতে মার্চ মাসে একাধিকবার কর্মবিরতি ও ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

১৩ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এ দ্বন্দ্ব ২৩ জুন পর্যন্ত গড়ায়। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমেও প্রায় সাড়ে তিন মাস একটানা অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দিল্লিতে পালিয়ে গেলে শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

পালানোর কয়েক দিনের মধ্যেই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় বলে জানান শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের। এরপর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও সমিতির কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

দীর্ঘ সময় পর এই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা পুনরায় সমিতির কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন শিক্ষকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, দীর্ঘদিন শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম স্থগিত থাকায় শিক্ষকরা তাদের মৌলিক অধিকার ও দাবি-দাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অচলাবস্থা নিরসন ও নতুন সমিতি গঠনের লক্ষ্যে আগামী ২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লাউঞ্জে এক মতবিনিময় সভার আহ্বান করা হয়েছে।

এরপর থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সমিতি গঠন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (কুকসু) নির্বাচনের আগে কোনো শিক্ষক সমিতি চায় না বলেও জানান শিক্ষার্থীরা।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আহমেদ ফয়সাল লিখেন, “ইতোমধ্যেই শিক্ষক সমিতি তাদের প্রোগ্রামের তারিখ ঘোষণা করেছে, অথচ ছাত্র সংসদের দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীরা এখনো উদাসীন। তাহের–মেহেদী গংয়ের নাটকে শুধু সিনিয়র ব্যাচ নয়, ১৬ বা ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও ভুক্তভোগী হয়েছে।

এই শিক্ষক সমিতি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করা ছাড়া শিক্ষার্থীদের কোনো কল্যাণে আসেনি। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই-ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আগে কোনো শিক্ষক সমিতি নয়। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে শিক্ষার্থীরা তা রুখে দেবে।”

একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম ভুঁইয়া বলেন, শিক্ষক সমিতির পক্ষ নিয়ে কেউ দালালি করতে এলে আগে আমাদের হারানো পাঁচ মাস ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিন। আবার যদি আমাদের অ্যাকাডেমিক জীবনের একটি দিনও নষ্ট হয়, একবিন্দু পরিমাণও ছাড় দেওয়া হবে না- না দালালদের, না সমিতিকে।

এদিকে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো সভা আহ্বান করতে হলে সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদকই তা করবেন। কিন্তু বিএনপিপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার গঠনতন্ত্রের বিধান ভঙ্গ করে সভার আহ্বান করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কুবি শিক্ষক সমিতির গঠনতন্ত্রের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদের নির্বাহী পরিষদের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার ক (১ ও ২) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, সভাপতি সকল সাধারণ সভা ও নির্বাহী পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করবেন এবং প্রয়োজনে রুলিং দেওয়ার ক্ষমতা রাখবেন। তিনি সাধারণ সম্পাদককে সভা আহ্বানের পরামর্শ দেবেন।

একই অনুচ্ছেদের (গ) ধারায় সাধারণ সম্পাদকের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, (১) সাধারণ সম্পাদক নির্বাহী পরিষদের পক্ষ থেকে সমিতির সকল কার্যক্রম পরিচালনা করবেন; (২) সভাপতির পরামর্শক্রমে সাধারণ ও নির্বাহী পরিষদের সভা আহ্বান করবেন।

সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক ছাড়া কীভাবে সভা আহ্বান করা হলো জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে কমিটি বিলুপ্ত, কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

যেহেতু বর্তমানে কোনো কমিটি নেই, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে আমি সবাইকে এক সভায় আহ্বান করেছি। শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করার জন্য আমাদের একটা প্ল্যাটফর্‌ম দরকার। অনেকদিন শিক্ষক সমিতি নেই। সবার মতামতের ভিত্তিতে গঠন প্রক্রিয়ার দিকে যেতে চাই। প্রয়োজনে আহ্বায়ক কমিটি করে পরে নির্বাচনের দিকে যাব।

জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১২ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে জামাত-বিএনপি সমর্থিত সাদা দলের প্যানেল কখনো জয়ী হয়নি।

এবার নির্বাচন হলে আওয়ামী লিগপন্থি শিক্ষকদের নীল দল অংশ নিতে পারবে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, নীল দলের শিক্ষকদের রাখার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষকদের থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এখনই আমরা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি না; নির্বাচন অনেক পরে হতে পারে।

এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের বলেন, আমরা জেনারেল মিটিংয়ের মাধ্যমে ৫ আগস্টের পর কমিটি বিলুপ্ত করেছি। বর্তমানে কোনো চলমান শিক্ষক সমিতি নেই।

নতুন সমিতি গঠনের জন্য সকল শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে তলবি সভা ডাকতে হবে। সাবেক ভিসি মঈন স্যারের আমলেও দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষকের স্বাক্ষরের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বাচন হয়েছিল। একইভাবে আহ্বায়ক কমিটি বা নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বাচন দেওয়া যেতে পারে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নীল দলের প্রতিনিধি পাঠানো বা নির্বাচন করার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা বর্তমানে কোনো কার্যক্রম করছি না। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে অংশগ্রহণের বিষয়টি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন