

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার যেন এগোচ্ছে না কিছুতেই। সাত বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় ঘটনায় বিচার শুরু হয়েছে তিন বছর আগে, কিন্তু এখন পর্যন্ত ১৬৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
কবে নাগাদ বিচার শেষ হবে—তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কেউ। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে তারা তৎপর, আর স্বজন হারানো পরিবারগুলো এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টা মোড়ের কাছে চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পাশাপাশি লাগানো ভবন, ভেতরে মজুত দাহ্য রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও সুগন্ধির ক্যান—সব মিলিয়ে মুহূর্তেই এলাকা পরিণত হয় অগ্নিকুণ্ডে।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর ৩৭টি ইউনিট টানা ১৪ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ৬৭টি পোড়া লাশ; পরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে।
এ ঘটনায় নিহত জুম্মনের ছেলে আসিফ আহমেদ চকবাজার মডেল থানায় মামলা করেন। তিন বছর তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আটজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক দুই ভাই; হাসান সুলতান ও হোসেন সুলতান অবৈধভাবে আবাসিক ভবনে দাহ্য রাসায়নিকের গুদাম ভাড়া দেন। বাকি ছয়জন ‘পার্ল ইন্টারন্যাশনাল’ নামে প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তদন্তে আরও বলা হয়, ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পার্ল ইন্টারন্যাশনালের তিনটি গুদাম ছিল। বিপুল পরিমাণ বডি স্প্রে, অ্যারোসল, গ্যাস লাইটারের ফুয়েল ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল সেখানে।
পুলিশের অভিযোগপত্রে ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানায়, পার্ল ইন্টারন্যাশনালের গুদাম থেকেই আগুনের সূত্রপাত। দোতলায় পলিব্যাগ সিল মেশিনের তাপ বা বৈদ্যুতিক স্পার্ক দাহ্য রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরণ ঘটায়।
ঘটনার পর চার ধরনের ৪৯টি আলামত সংগ্রহ করা হয়। সিআইডির পরীক্ষাগারে পরীক্ষায় সুগন্ধির ক্যান ও বোতল থেকে উচ্চমাত্রার দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যার মধ্যে ছিল ইথাইল অ্যালকোহল, বিউটেন, আইসো বিউটেন, প্রোপেইনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক।
প্রত্যক্ষদর্শী জিন্নাত আলী বাবু ও খান মাহমুদ শাহ জানান, আগুনের সময় ক্যানগুলো সশব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছিল এবং জ্বলন্ত ক্যান রাস্তায় ছিটকে পড়ছিল।
এদিকে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। বর্তমানে ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ খোরশেদ আলমের আদালতে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
সর্বশেষ নির্ধারিত দিনে কোনো সাক্ষী হাজির হননি। মামলার ১৬৭ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, আদালত থেকে সমন পাঠানো হলেও সাক্ষীরা হাজির হচ্ছেন না। তারা নিয়মিত সাক্ষ্য দিলে বিচার দ্রুত শেষ করা সম্ভব।
মামলার বাদী আসিফ আহমেদ বলেন, বছরে একবার সরকার খোঁজ নেয়, ছবি তোলে কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেই।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তো বিচারই শেষ হয়নি। আমরা আদৌ সুষ্ঠু বিচার পাব কি না, সন্দেহ আছে।
আসামি হাসান ও হোসেনের আইনজীবী মো. মোস্তফা পাঠান (ফারুক) বলেন, তাদের মক্কেলরাও ভিকটিম। ভবন পুড়ে গেছে, তাদের মা আহত হয়ে পরে মারা গেছেন। তিনি দাবি করেন, মামলাটি ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ উপস্থাপন করা হয়েছে এবং নিরপরাধদের আসামি করা হয়েছে।
স্বজন হারানো পরিবারগুলোর একটাই দাবি বিচার হোক, দ্রুত হোক, কিন্তু তা যেন হয় প্রকৃত ন্যায়বিচার।
মন্তব্য করুন
