

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দেশের রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়োজনে মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয়েছে ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’।
প্রায় তিন বছর পর আয়োজিত দ্বিতীয় এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সম্মেলনস্থলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। দায়িত্ব নেওয়ার পর এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এটিই তার প্রথম সরাসরি বৈঠক। ফলে রাজস্ব আহরণের বর্তমান পরিস্থিতি, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এবং এনবিআরের সক্ষমতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি রাজস্ব বাড়াতে সরকারের দিকনির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই লক্ষ্য ৪৫ শতাংশের বেশি। ফলে বড় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুধু করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতা শনাক্ত, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে কর আদায়ের বাস্তব সমস্যা, করদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক, তদারকির দুর্বলতা এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের সমন্বয়হীনতা দূর করা না গেলে বড় এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
* কর-জিডিপি ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা
রাজস্ব সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬-৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এনবিআর ২০৩৫ সালের মধ্যে এ অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এ জন্য করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা, কর ফাঁকি শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজস্ব প্রশাসনের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্মেলনে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব রাজস্ব প্রশাসনের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। সম্মেলন আয়োজনের আগে এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নতুন নেতৃত্বের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ‘টিম এনবিআর’ গড়ে তোলা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন কর্মউদ্দীপনা তৈরি করা।
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন চাপ ও প্রশাসনিক টানাপড়েনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমিয়ে রাজস্ব আহরণে সবাইকে একই লক্ষ্যে কাজ করানোর বিষয়টিও সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
* তিন রাজস্ব শাখাকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা
এবারের সম্মেলনে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-রাজস্ব প্রশাসনের তিনটি প্রধান শাখাকে একই প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বাস্তব সমস্যার কথা শোনা এবং সেগুলোর ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর ফাঁকি, ভ্যাট ফাঁকি, চোরাচালান, উৎসে কর আদায় এবং রাজস্ব প্রশাসনের তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে শুধু প্রশাসনিক চাপ নয়, করদাতাদের আস্থা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে-কর দিতে গিয়ে হয়রানি, জটিলতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
এ কারণে করদাতার সঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সম্পর্ক আরও পেশাদার ও সেবামুখী করা, ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো এবং কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি সামনে আসছে।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকারের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতির গতি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর নানা চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যমান কর ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ করাই সরকারের জন্য তুলনামূলক কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজস্ব সম্মেলন তাই শুধু কর্মকর্তাদের উৎসাহ দেওয়ার অনুষ্ঠান নয়; বরং আগামী কয়েক বছরে দেশের রাজস্ব প্রশাসন কোন পথে এগোবে, তার একটি নীতিগত রূপরেখা তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্রায় ১ হাজার ৫০০ অতিথির অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অর্থনীতি, রাজস্ব ও বাণিজ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করেছেন।


