

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল ইউনিয়নের দশসিকা গ্রামে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি নথিতে আব্দুর রশিদ ও সালেহ আকরামের পিতা হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী এস এম আবুল কাসেমের নাম থাকলেও তারা প্রকৃতপক্ষে রুস্তম আলী ও রেহানা বেগমের সন্তান।
স্থানীয়দের দাবি, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী এস এম আবুল কাসেমের প্রকৃত বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের সিংগারগাতি গ্রামে। তিনি দশসিকা গ্রামের জামাই। অথচ অভিযোগ রয়েছে, রুস্তম আলীর দুই ছেলের সরকারি কাগজপত্রে তাদের পিতা হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী এস এম আবুল কাসেমের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ আছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়ে একজন প্রায় ১০ বছর ধরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। অপরজন প্রায় ১৫ বছর ধরে সরকারের একটি বিশেষ বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ছোটবেলা থেকে খালা ও খালুর কাছেই তারা বড় হয়েছেন। এ কারণে তাদের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের সিংগারগাতি এবং কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল ইউনিয়নের দশসিকা গ্রামে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী এস এম আবুল কাসেম ব্যক্তিগত জীবনে এক কন্যাসন্তানের জনক। তার একমাত্র কন্যা আমেনা খাতুন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রুস্তম আলীর দুই ছেলের সরকারি নথিতে পিতা হিসেবে গাজী এস এম আবুল কাসেমের নাম এবং মাতা হিসেবে তার দ্বিতীয় স্ত্রী রেজিয়া পারভীনের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
রুস্তম আলী ও রেহানা বেগমের কাছে তাদের সন্তানদের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, তাদের তিন ছেলে বড় ছেলে আব্দুর রশিদ সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার হামকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মেজো ছেলে সালেহ আকরাম সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন এবং ছোট ছেলে আবু সাঈদ বাড়িতে থাকেন ও পড়াশোনা করছেন।
এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী এস এম আবুল কাসেমের দ্বিতীয় স্ত্রী রেজিয়া পারভীেকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এতদিন তো সবাই জানে, কোনো সমস্যা হয়নি। এখন কেন সমস্যা হবে?’
তবে বোনের ছেলেদের মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরির সুবিধা দেওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধা সনদ কেন ব্যবহার করা হয়েছে এ প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি তিনি।
তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী এস এম আবুল কাসেমের একমাত্র কন্যা আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমি আমার পিতা কাসেম আলীর একমাত্র কন্যা। আমার আর কোনো ভাই-বোন নেই। কতিপয় দুষ্কৃতকারীদের সহায়তায় তারা এই সনদ নিয়েছে। আমি এর বিচার ও শাস্তি চাই। এ সময় তিনি তার পিতার ওয়ারিশ সনদের একটি কপি অনুসন্ধানী দলের কাছে তুলে দেন।’
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে হামকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রশিদ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি তার খালুর নাম ব্যবহার করে আসছেন। এতদিন কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এটিই তার আসল পরিচয়’।
আরেক অভিযুক্ত সালেহ আকরাম বলেন, খালা ও খালু তাদের ছোটবেলা থেকে লালন-পালন করেছেন। সে কারণেই তাদের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এতে অন্যায়ের কিছু দেখছেন না বলেও দাবি করেন তিনি। বর্তমানে তিনি কুমিল্লায় কর্মরত বলে জানান।
অভিযোগের বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ বলেন, ‘খালুকে পিতা বানিয়ে চাকরি, এমন ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তাহলে তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) রোজিনা আক্তার বলেন, ‘খালুকে পিতা বানিয়ে চাকরি, এটা খুবই চাঞ্চল্যকর ঘটনা। কীভাবে এতদিন চাকরি করে যাচ্ছে, বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ওয়ারিশ সনদ নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে জাল ওয়ারিশ সনদ দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাবেক চেয়ারম্যান এনামুলের বিরুদ্ধেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়া গেলে কিংবা এ বিষয়ে রিপোর্ট হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পারিবারিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। তাদের দাবি, তদন্তে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে এলে একই সঙ্গে ভুল পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও পরিষ্কার হবে।


