শনিবার
৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক টেন্ডার, শত প্রশ্ন: পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেনাকাটার গল্প

বরিশাল প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
expand
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট দরপত্র বাতিল করা হলেও এখন পর্যন্ত জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্রের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া কার্যত থমকে আছে।

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল শীর্ষনিউজ ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আলোচিত দরপত্রটি বাতিল করে। একই সঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। তবে একাধিক সূত্রের দাবি, দরপত্র বাতিল হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনো নিজ নিজ পদে বহাল রয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা এবং তাঁর স্বামী পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. মশিউর রহমান এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত একটি সিন্ডিকেটের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। প্রকল্প পরিচালক ডা. এস এম কবির হাসানও বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন।

সূত্র জানায়, গত বছরের ২৭ অক্টোবর পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য প্রায় ৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতি, অ্যানেসথেশিয়া সরঞ্জাম, এক্স-রে ইউনিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণের সঙ্গে ঘড়ি, টেলিভিশন ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ মোট ৭০৩টি আইটেম একত্রে একটি লটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী এত বৈচিত্র্যময় পণ্য এক লটে অন্তর্ভুক্ত করা বিধিমালার পরিপন্থি। এ বিষয়ে গত ২ নভেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। অভিযোগটি করেন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল ইসলাম।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, দরপত্রে নিম্নমানের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা পিপিআর-২০২৫-এর লঙ্ঘন। পাশাপাশি পাঁচ বছরের পরিবর্তে দুই বছরের ওয়ারেন্টি নির্ধারণ এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বদলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন গ্রহণযোগ্য করার মতো শর্ত যুক্ত করা হয়, যা মানসম্মত সরঞ্জাম সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

অভিযোগকারীরা আরও বলেন, একই লটে বিপুলসংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন পণ্য অন্তর্ভুক্ত করায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান এককভাবে ৭০৩টি আইটেম সরবরাহে সক্ষম নয়, ফলে দরপত্রটি কার্যত একচেটিয়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত পুরো দরপত্র বাতিল করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দরপত্র বাতিল হলেও পূর্বের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর আগেও পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৯টি প্যাকেজের আওতায় প্রায় ১০৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়ে গুরুতর টেন্ডার জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বিল পরিশোধের দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই সব যন্ত্রপাতির একটি অংশ এখনো সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শুধু দরপত্র বাতিল করাই যথেষ্ট নয়। আগের ও বর্তমান সব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X