সোমবার
১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৮০ বছর বয়সে ১৬ বার ভাঙনে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই জেবল হকের

আরিফ সবুজ, নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
মেঘনা নদী ভাঙনে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই জেবল হকের
expand
মেঘনা নদী ভাঙনে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই জেবল হকের

জেবল হকের বয়স এখন আশি। এই দীর্ঘ জীবনে তিনি অন্তত ১৬ বার ঘর বেঁধেছেন, আর ১৬ বারই সেই ঘর বিলীন হয়েছে মেঘনার উদরে।

পৈতৃক ভিটা সন্দ্বীপের হুদ্রাখালি থেকে শুরু করে নোয়াখালী সদর, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাযাবরের মতো ঘুরেছেন তিনি।

আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার নির্বাক দৃষ্টি মেঘনার বিশাল জলরাশির দিকে। বৃদ্ধ জেবল হকের মনে এখন কেবল একটাই প্রশ্ন মৃত্যুর পর কি সাড়ে তিন হাত মাটি জুটবে, নাকি শেষ ঠিকানাও হবে ওই সর্বনাশা মেঘনায়?

​নোয়াখালীর মেঘনা উপকূলীয় এলাকায় জেবল হকের মতো এমন হাজারো মানুষের গল্প একই সুতায় গাঁথা। নদী ভাঙনের তাণ্ডবে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলোর কাছে মেঘনা কেবল একটি নদী নয়, এক আতঙ্কের নাম। বারবার ঘর বদলে এখন অন্যের আশ্রয়ে বা সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের খুপরি ঘরে দিন কাটছে অনেকের।

​জেবল হক আক্ষেপ করে বলেন, আট সন্তানের কাউরে কিছু দিয়া যাইতে পারি নাই। তাই এহন কেউ আর খবর লয় না। ছোট ছেলের লগে একটি আশ্রয়ন কেন্দ্রে আছি। ডর লাগে, এইডাও যদি গাঙে লইয়া যায়, তবে মরার পর মাটি পামু কই?

জেবল হক বর্তমানে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের নদী তীরবর্তী অন্যের দেয়া একটি ব্যারাকে রায়ত রয়েছেন।

কেবল জেবল হক নন, সাহাব উদ্দিন মাঝি, রহমত উল্লাহ কিংবা আকবর হোসেনদের মতো শত শত মানুষের আর্তনাদ এখন উপকূলের বাতাসে ভাসে। কেউ চারবার, কেউ পাঁচবার ভাঙনের শিকার হয়েছেন।

বর্তমানে যারা নদী তীরে বসবাস করছেন, তাদের অনেকেরই দিন কাটে নির্ঘুম। ভাঙন শুরু হওয়ার আগেই অনেকে নিজের তিল তিল করে গড়া ঘরটি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।

তাদের দাবি একটাই- ত্রাণ নয়, তারা চান মাথা গোঁজার এক চিলতে নিশ্চিত আশ্রয় আর একটি টেকসই বাঁধ।

​জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, নোয়াখালীর ৯টি উপজেলার মধ্যে কোম্পানীগঞ্জ, সুবর্ণচর ও হাতিয়ার প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে তীব্র নদী ভাঙনের কবলে। এর মধ্যে ২০ কিলোমিটার এলাকায় দ্রুত কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

​নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস.এম. রেফাত জামিল জানান, হাতিয়ায় ৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া বাকি ১৪ কিলোমিটার এলাকার ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

​যুগের পর যুগ ধরে ব্লক-বাঁধের আশ্বাস শুনে আসছেন মেঘনাপাড়ের মানুষ। কিন্তু সেই আশ্বাস আর বালুর বস্তা অধিকাংশ সময় জোয়ারের তোড়ে ভেসে গেছে। উপকূলীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, এবার আর ফাঁকা আশ্বাস নয়; সরকার দ্রুত একটি টেকসই ক্রসড্যাম বা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে তাদের ভিটেমাটি রক্ষা করবে।

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে শেষ বিকেলের আলোয় জেবল হকের মতো বৃদ্ধরা এখনো স্বপ্ন দেখেন একদিন মেঘনা শান্ত হবে, আর তাদের উত্তরসূরিদের অন্তত যাযাবর হতে হবে না।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X