

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেছেন, শিক্ষা দলীয়করণের বাইরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তার এমন ঘোষণার ঠিক একদিন পরে ৭-৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এমন দাবি করেন তিনি।
অধ্যাপক মামুন বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত ১৫-ই মার্চ বলেছিলেন, শিক্ষা কারো ব্যক্তিগত বা দলীয় বিষয় নয়, বরং এটি সবার মৌলিক অধিকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণের বাইরে রাখার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। অথচ তার ঠিক এক দিন পরেই দেশের ৭-৮ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দিলেন সম্পূর্ণভাবে দলীয় ভিত্তিতে। অথচ এর আগে তিনি আরো বলেছিলেন সার্চ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ দিবেন। আমিও একাধিকবার বলেছিলাম একটি আন্তর্জাতিক সার্চ কমিটির মাধ্যমে অন্তত প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দেওয়ার একটি পাইলট মডেল প্রজেক্ট হাতে নিতে পারতেন।’
পদার্থবিজ্ঞানের এ অধ্যাপক বলেন, ‘আসলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঠামোই এমন যে এখানে দলীয় ভিত্তিতে ভিসি নিয়োগ না দিলে ১ মাসও কেউ টিকতে পারবে কিনা সন্দেহ। বাংলাদেশের ভিসিরা দিবসে যেইসব কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে তার ৮০% কাজই সভ্য দেশের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের করতেই হয় না। অর্থাৎ আমাদের ভিসিদের ৮০% কাজ ভিসিদের কাজ না। এই ৮০% কাজ কি কি? প্রথমত বুঝতে হবে ভিসি একটি এডমিনিস্ট্রেটিভ পোস্ট। কোন একাডেমিক শিক্ষক বা গবেষকের এই পদে যাওয়ার ইচ্ছে থাকার কথা না যদিনা সে চাকুরীর শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায় এবং গবেষণার প্রডাক্টিভিটি প্রায় শূন্যের কোঠায়।’
ভিসি নিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের সকল দৈনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত মাতামাতি সেটা কেন? এমন প্রশ্নে রেখে তিনি বলেন, ‘কারণ ওই ৮০% কাজের জন্যই। ওই ৮০% কাজের জন্য সরকার এই পদকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ওই অযাচিত ৮০% কাজ দিয়েই বাংলাদেশের সরকারগুলো এই একজন ভিসির মাধ্যমে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ করে। এই ৮০% কাজে কি কি আছে? প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়ের যত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রমোশন হয় তার নিয়ন্ত্রণ করে ভিসি বা ভিসির মাধ্যমে প্রো-ভিসি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ ও প্রমোশন বোর্ডের প্রধান থাকেন একজন প্রশাসক। অথচ এটি একটি অত্যন্ত একাডেমিক কাজ যেই কাজের সাথে পৃথিবীর কোথাও কোন ভিসি সরাসরি যুক্ত থাকে না। এমনকি নিজে যেই বিষয়ের শিক্ষক সেই বিভাগেরও না।
এছাড়া ৮০% এর মধ্যে থাকে নিজ দলের ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারে তাদের সর্বোচ্চ সাহায্য করা। বিনিময়ে নিজ দলের ছাত্র শিক্ষকরাও ভিসির বিপদে সর্বোচ্চ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ৮০% এর মধ্যে থাকে বিভিন্ন কনফারেন্স, সভা সেমিনার উদ্বোধন করা, খেলাধুলা উদ্বোধন করা, নিজ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা, সারাদিন নানা তদবির শোনা, নানা কমপ্লেইন শোনা, শিক্ষকদের শিক্ষা ছুটি থেকে শুরু করে নানা বিষয়ের সমস্যা শোনা, বিবাদমান দলীয় ছাত্রদের অন্তঃকলহ মেটানো ইত্যাদি। এইসব কাজের জন্যই ভিসিরা থাকে সব সময় ক্যামেরার সামনে আর তাই সারা বাংলাদেশের সবাই তাকে চেনে। বিশ্বের ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে রেন্ডমলি কোন একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেনতো তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির নাম বলতে। পারবে না। যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে সবাই চেনে সেটা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ই না।’
সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে হলে দরকার রিফর্মের এবং গত ইন্টেরিমের সময়ই এইটা করার শ্রেষ্ট সময় ছিল জানিয়ে অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘কিন্তু অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানও প্রথাগত ভিসিদের মতোই নিজের মেয়াদ কাল চালিয়েছেন। শুরুতে ভেবেছিলাম আমরা বুঝি আমাদের কাঙ্খিত ভিসি পেয়ে গেছি। পরে দেখেছি ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে উনারও একটি নির্দিষ্ট দলীয় সাপোর্ট ছিল এবং উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এর আগের ৩০ বছরের ভিসিরা যা করে গিয়েছেন উনি হুবহু তা করে গেছেন। একটি ভালো কাজ করার উদাহরণ রেখে যেতে পারেননি।
বলেছিলাম উপাচার্যের ক্ষমতাকে অর্ধেক করে ফেলেন। অর্থাৎ অন্তত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রমোশনের ৩টি স্তর করে প্রতি স্তরে ফিল্টারিং পদ্ধতি চালু করে শিক্ষক নিয়োগ দিন। আমি আশা করেছিলাম একটি শিক্ষক ট্যালেন্ট হান্ট প্রজেক্ট নিবেন। আমি ভেবেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬টি রিসার্চ সেন্টার থেকে বড়জোর ১০টি রিসার্চ সেন্টারে নামিয়ে আনতে। বলেছিলাম সংখ্যা নয় গুনেমানের দিকে নজর দিন। বলেছিলাম যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যার নামের কারণে এটি কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্সের জন্মস্থান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামের সেন্টার এমন হবে যেন বিশ্ববাসী জানতে পারে সত্যেন বোস এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার জীবনের শ্রেষ্ট সময়ের ২৪টি বছর কাটিয়ে বোস-আইনস্টাইন তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। অথচ সেই বোসের নামের সেন্টারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে অবহেলিত। চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলাম এটিকে উন্নত মানের করতে কিন্তু তিনি সরাসরি সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। সেই জন্য বোস সেন্টারের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলাম। তারপরও কি তাকে ভালো ভিসি বলা যাবে? আর অন্যান্য বিষয়তো আছেই যেইগুলো অন্য একদিন বলব।’
ভিসিরা কি কাজ করবে? এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘ভিসিরা শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের জন্য লেখাপড়া ও গবেষণার পরিবেশ তৈরী করতে দিনরাত চিন্তা করবে। কি করলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসে সেগুলো নিয়ে ভাববে এবং পদক্ষেপ নিবে। ১০০ বছরের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো একটা আন্তর্জাতিক মানের গেস্ট হাউস নাই যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশী শিক্ষক গবেষক ও বিদেশী শিক্ষকরা নিয়মিত আসবে, থাকবে, পড়াবে ও গবেষণা করবে ও করাবে। সেই গেস্ট হাউসে থাকবে উন্নত মানের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা। বিদেশী অনেকেই পার্ট টাইম শিক্ষক হিসাবে এসে একটি সেমিস্টার পরিয়ে যাবে। এতে ক্যাম্পাসের আন্তর্জাতিকতা বৃদ্ধি পাবে, বিশ্ব রেঙ্কিং এর উন্নতি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একজন পদার্থবিজ্ঞানের ভিসি পেয়েছে। তাকে স্বাগতম। তার নেতৃত্বে আশা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে দেশবাসীর আশা আকাঙ্খাকে পূরণ করবে। নবনিযুক্ত ভিসির সফলতা মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতা মানে বাংলাদেশের সফলতা। ভিসি ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে স্বাগমত।’
মন্তব্য করুন