বৃহস্পতিবার
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বৈদ্যুতিক শকের আগ্রাসন, মাছ শূন্যতার পথে শিবচরের নদ-নদী

মো. সিরাজুল ইসলাম, শিবচর (মাদারীপুর)  প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:২১ পিএম
বৈদ্যুতিক শক মেশিন দিয়ে করা হচ্ছে মাছ শিকারী
expand
বৈদ্যুতিক শক মেশিন দিয়ে করা হচ্ছে মাছ শিকারী

জালের ঘের নেই, নেই কোন বড় নৌকার তোড়জোড়। ওপর থেকে শান্ত মনে হলেও বৈদ্যুতিক শকের অদৃশ্য আগুনের ঝিলিক নিমিষেই শেষ করে দিচ্ছে পানির নীচে থাকা অজস্র প্রাণ।

রেনু পোনা থেকে শুরু করে ডিম পাড়তে আসা মা মাছ পর্যন্ত কেউ রেহাই পাচ্ছে না। এই চিত্র এখন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার নদ-নদী ও খাল বিলের।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, শিবচরের পদ্মা নদী তীরবর্তী এলাকা, আড়িয়াল খাঁ নদ, বিলপদ্মা নদী ও বিল-বাওরে পালস ফিসিং বা বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ নিধন এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

প্রথমে শখের বশে ২০১৯-২০ সালে স্বল্প পরিসরে শুরু হলেও এটি এখন দ্রুতই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আর বৈদ্যুতিক এই মরন ফাঁদ নদী-নালা গুলোকে স্হায়ী বন্ধাত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বৈদ্যুতিক শক মেশিন দিয়ে শিকার করা এক মাছ শিকারী জানান, এসব মেশিন সাধারণত ব্যাটারী বা জেনারেটরের সাহায্যে চলে। হিট মেশিনে তৈরী বৈদ্যুতিক প্রবাহ পানিতে ছড়িয়ে দিলে মেশিন ভেদে ৫ থেকে ৩০ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা পানির অজস্র মাছ চোখের পলকে নিথর হয়ে ভেসে ওঠে।

অতঃপর বিশেষ জালের মাধ্যমে মাছ গুলো নৌকায় তোলা হয়।এভাবে অল্প সময়ে অধিক মাছ শিকার করা যায়। যার কারণে এই পদ্ধতিতে মাছ ধরার আগ্রহটা একটু বেশী।

পদ্মাপাড়ের জেলে সহ অন্যান্য এলাকার জেলেদের অভিযোগ, আগে নদীতে জাল ফেললে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ উঠত।এখন আর সে ভাবে মাছ পাওয়া যায় না।

বৈদ্যুতিক শক মেশিন ও অন্যান্য অবৈধ উপায়ে মাছ ধরতে ধরতে এখন যেন নদী মাছশূন্য হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এ পেশায় আমাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। দিনদিন অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও বাড়বে। তাই এর একটা বিহিত হওয়ার দরকার।

স্হানীয়রা জানান, পদ্মানদী তীরবর্তী চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ী,মাদবর চর,আড়িয়াল খাঁ'র শিরুয়াইল,নিলখী আর বিলপদ্মার বাঁশকান্দি ইউনিয়নে বিভিন্ন সংঘবদ্ধ চক্র নদীতে বিদ্যুতের বিষ ঢেলে দিয়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার করছে।

এই ভাবে মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে আগামী দুই তিন বছরের মধ্যে নদীতে দেশীয় প্রজাতির মাছশূন্য হয়ে পড়বে। বিধায় এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

শিবচর উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, বৈদ্যুতিক শক সহ বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারের ফলে দেশীয় মাছের উৎপাদন ক্রমাগতভাবে কমতেছে।২০২৪ সালে শিবচরের পদ্মানদী, আড়িয়াল খাঁ নদ ও বিলপদ্মা নদীতে উৎপাদিত মাছের পরিমাণ ছিল ১৭৫২ মেট্রিক টন।

২০২৫ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫৩০ মেট্রিক টন।যার নেতিবাচক প্রভাব প্রচ্ছন্ন ভাবে শিবচর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের উপর পড়ছে।

মাদারীপুর সরকারি কলেজের প্রাণী বিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শরীফ মো.হুব্বুল কবির বলেন, বৈদ্যুতিক শকের প্রভাবে প্রায় সব মাছ মারা যায়। তবে যেসব মাছ বৈদ্যুতিক শক খেয়েও বেঁচে যায় তাদের ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয় স্হায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।

ফলে তারা আর পোনা উৎপাদন করতে সক্ষম হয় না। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে শিকার করলে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ পানি বাহিত হয়ে মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ও থাকে।

তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, বৈদ্যুতিক শক কেবল মাছেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নদীর তলদেশে বসবাসকারী সাপ,ব্যাঙ,কাঁকড়া, শামুক ও ঝিনুক যারা নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নীরব প্রহরীর ভূমিকা পালন করে তারাও গণহারে মারা যায়।

এসব প্রাণী ধ্বংস হওয়ায় নদীর খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, পানি দূষণ বাড়ে এবং নদী তার স্বাভাবিক পুনর্জীবন ক্ষমতা হারায়।

শিবচর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার জানান, উপজেলার বিভিন্ন নদীতে গভীর রাতে কিছু অসাধু জেলে বৈদ্যুতিক শক ব্যবহার করে অবৈধভাবে মাছ শিকারে লিপ্ত—এমন অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে।

এসব অপরাধ দমনে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানো হচ্ছে। কম্বিং অপারেশনের আওতায় একাধিকবার তল্লাশি পরিচালিত হলেও এখনো কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি।

এ ক্ষেত্রে নৌ পুলিশের সক্রিয় সহযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে এবং অবৈধ মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান জানান, শিবচরের বিভিন্ন নদ-নদীতে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ করে মাছ শিকারের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

নদীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X