

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ফরিদপুরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ ইজিবাইক চোরচক্রের ‘কারখানা মডেল’ অপারেশনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। চুরি করা ইজিবাইক ভেঙে খণ্ডিত যন্ত্রাংশ আলাদা করা, ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর পরিবর্তন, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি এবং পুনরায় জোড়া লাগিয়ে ‘নতুন’ গাড়ি হিসেবে বিক্রি—এভাবেই চলছিল তাদের অবৈধ বাণিজ্য।
জেলা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে আন্তঃজেলা এই চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১৮টি ইজিবাইকসহ বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “এটি একটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত চক্র। শনাক্ত এড়াতে তারা ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর পর্যন্ত পরিবর্তন করেছে।”
শহরের কোর্টপাড়া জামে মসজিদের সামনে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা একটি ইজিবাইক চুরি হয়। ভুক্তভোগী চালকের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে ফরিদপুর কোতয়ালী থানা পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রথমে আলাল ফকিরকে আটক করা হয়। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলে চক্রের অন্যান্য সদস্যদের পরিচয় পাওয়া যায়। পরবর্তী অভিযানে একে একে গ্রেপ্তার করা হয় বাকি সদস্যদের।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মোজাম্মেল মণ্ডল, ইলিয়াস হোসেন, আবুল হোসেন মোল্লা, তানভীর শেখ, আওয়াল বিশ্বাস, বদিউজ্জামান মোল্লা, মৃদুল মীর মালোত, মিলন খান, আশরাফ, শহীদ সিকদার, জুয়েল রানা ও রনি মিয়া। তাদের বাড়ি ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাগুরা ও জামালপুর জেলায়। পুলিশ জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে ইজিবাইক চুরি ও চোরাই গাড়ি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত।
তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি নির্জন এলাকা টার্গেট করে ইজিবাইক চুরি করত। পরে গোপন গ্যারেজে নিয়ে চ্যাসিস, বডি, গ্লাস ও কেবিন আলাদা করা হতো। ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর ঘষে ফেলে নতুন নম্বর বসানো হতো। ভুয়া সিলমোহরযুক্ত প্যাডে তৈরি করা হতো কাগজপত্র। এরপর খণ্ডিত অংশ জোড়া লাগিয়ে ‘রিফার্বিশড’ ইজিবাইক হিসেবে বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হতো।
পুলিশ জানায়, অস্বাভাবিক কম দামের কারণে অনেক ক্রেতা কাগজপত্র যাচাই না করেই গাড়ি কিনে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া ১৮টি ইজিবাইকের মধ্যে ১২/১৩টি সচল এবং ৫/৬টি অচল অবস্থায় রয়েছে (তদন্তাধীন তালিকা সমন্বয় চলছে)। এছাড়া ৪টি চ্যাসিস, একটি কাটা বডি অংশ, ৭টি গ্লাস ফ্রেম, ৩টি কেবিন, ২টি মাঝের ও ২টি পিছনের বেড়া, ২টি বাম্পার, ১টি সকেট জাম্পার, ১টি কাটার মেশিন এবং প্রায় পাঁচ ট্রাক খণ্ডিত যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে।
বোয়ালমারী, মধুখালী, নড়িয়া ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত একটি ইজিবাইক ২০২৫ সালের একটি চুরি মামলার বলে শনাক্ত হয়েছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ইজিবাইক ও অটোরিকশা চালকদের ওপর হামলা, হত্যা, ছিনতাই ও চুরির প্রায় অর্ধশতাধিক ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনার রহস্য উদঘাটন হলেও কিছু মামলার তদন্ত এখনও চলমান।
ইজিবাইক এখন নিম্নআয়ের মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকা। একটি গাড়ি হারানো মানে একটি পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, “চক্রটির আরও সদস্য থাকতে পারে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অস্বাভাবিক কম দামে ইজিবাইক কিনবেন না এবং বৈধ কাগজপত্র যাচাই করে নিন।”
এলাকাবাসীর মতে, ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর ডিজিটাল ডাটাবেজে তাৎক্ষণিক যাচাই, গ্যারেজ লাইসেন্সিং কঠোর করা এবং সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ না হলে এ ধরনের চক্র নতুন কৌশলে আবারও সক্রিয় হতে পারে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধি প্রতারণা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য করুন
