রবিবার
১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লোকসানের শঙ্কায় কক্সবাজারের খামারিরা

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ১১:৪০ এএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

গোয়ালভরা গরু, তবুও মুখে হাসি নেই কক্সবাজারের খামারিদের। সামনে ঈদুল আজহা। জেলার খামারগুলোতে কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে।

কিন্তু উৎপাদন খরচের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতিতে এবার লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে কি না সেই শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। এর মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ঢুকতে থাকা বার্মিজ গরু।

খামারিদের অভিযোগ, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি ও গর্জনিয়া এলাকাসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে নদীর স্রোতের মতো গরু ঢুকছে। এতে স্থানীয় বাজারে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে গো-খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে কোরবানির পশুর দাম বাড়বে বলে শঙ্কায় রয়েছেন ক্রেতারাও।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বর্তমানে খামারের সংখ্যা ৮ হাজার ২৮৭টি। এসব খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৩টি পশু। অথচ জেলায় সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৯২টি। সেই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকছে ২৪ হাজার ৭৭১টি পশু।

প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে ৬৩ হাজার ১৩৯টি ষাঁড়, ২৪ হাজার ২৮৩টি বলদ, ১৬ হাজার ৪৫১টি গাভী, ৬ হাজার ২৭৯টি মহিষ, ৩৩ হাজার ৫৫২টি ছাগল এবং ১৪ হাজার ৪৬৩টি ভেড়া।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ. এম. খালেকুজ্জামান বলেন, 'জেলার আট উপজেলায় কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত থাকায় সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই।'

পশুর সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও খামারিদের প্রধান দুশ্চিন্তা এখন উৎপাদন ব্যয়। খামারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর গো-খাদ্যের দাম প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বর্তমান বাজারে ভুট্টার গুঁড়া বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়, গমের ভুষি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা এবং খৈল ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। ব্র্যান্ডভেদে ২৫ কেজির ক্যাটল ফিডের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়।

ঈদগাঁওয়ের রশিদনগর ইউনিয়নের খামারি শহিদুল ইসলাম বলেন, 'গত বছর আমার খামারে ৩৯টি গরু ছিল। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার কমিয়ে ২০টিতে আনতে হয়েছে। খামারিরা গরু কম পালন করছে, তাই বাজারে দামও বেশি হতে পারে।'

একই এলাকার যৌথ খামারি ডালিম ও শাকিলের খামারে বর্তমানে প্রায় ৫০টি গরু রয়েছে। তাদের খামারের পশুর দাম তিন লাখ থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত।

ডালিম বলেন, 'এবার গরু মোটাতাজা করতে অনেক বেশি খরচ হয়েছে। হাটে ন্যায্য দাম না পেলে উৎপাদন খরচই উঠবে না। পুঁজি ধার করে খামার করেছি, তাই লোকসান হলেও বিক্রি করতে হবে।'

রামুর কচ্ছপিয়ার খামারি হেলাল উদ্দিন জানান, তার খামারে ১৫টি গরু রয়েছে। পাঁচ মণ ওজনের একটি ষাঁড়ের দাম ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তার ধারণা, তিন থেকে চার মণ ওজনের গরু বিক্রি হবে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।

উখিয়ার খামারি জাকির হোসেন বলেন, 'আগে পরিত্যক্ত জমিতে ঘাস পাওয়া যেত, এখন সেটাও নেই। খাদ্যের দামও বাড়ছে। অভাবের কারণে কোরবানির আগেই তিনটি গরু বিক্রি করে দিতে হয়েছে।'

খামারিদের অভিযোগ, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বার্মিজ গরু প্রবেশ করছে। বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি ও গর্জনিয়া সীমান্ত দিয়ে এসব গরু স্থানীয় বাজারে ঢুকে পড়ছে। এতে দেশীয় খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

খামারিদের ভাষ্য, সীমান্তপথে কম দামে আসা গরু বাজারে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়ভাবে লালন-পালন করা গরুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে কোরবানিদাতাদের ওপরও। পূর্ব কলাতলীর বাসিন্দা হাসান আলি বলেন, 'ছয় মণ ওজনের একটি বলদের দাম চাওয়া হচ্ছে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। কয়েক বছর আগেও এই দামে আরও বড় গরু পাওয়া যেত।'

বাহারছড়ার আবুল শামা এখনো হাটে যাননি। তবে আগাম খোঁজ নিয়ে তিনি বুঝতে পারছেন, এবার কোরবানির খরচ বাড়বে। তিনি বলেন, 'শুনছি গরু-মহিষের দাম অনেক বেশি। তাই হয়তো ভাগে কোরবানি দিতে হবে।'

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার অনেকে এককভাবে গরু কোরবানি না দিয়ে অংশীদারিতে কোরবানি দিতে পারেন। কেউ কেউ ছাগলের দিকেও ঝুঁকছেন।

খামারি ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি বছরের মতো এবারও দুই থেকে তিন মণ ওজনের মাঝারি গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি থাকবে। বড় আকারের গরু নিয়ে বেশি দাম আশা করলে বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। কারণ সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ. এম. খালেকুজ্জামান জানান, খামারিদের কাঁচা ঘাস ও খড় বেশি খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে খাদ্য ব্যয় কিছুটা কমানো যায়।

তিনি বলেন, 'ক্ষতিকর উপায়ে পশু মোটাতাজা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি পশুর হাটে মেডিকেল টিম থাকবে, যাতে অসুস্থ পশু বিক্রি না হয়।'

জেলা পুলিশ সুপার এ. এন. এম. সাজেদুর রহমান বলেন, 'কোরবানির পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। চুরি ও ছিনতাই রোধে বিশেষ নজরদারি থাকবে।'

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এ বছর কক্সবাজারে মোট ৯৪টি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে ৪৮টি স্থায়ী এবং ৪৬টি অস্থায়ী হাট। অস্থায়ী হাটগুলোর ইজারা প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS Spain
Scheduled
15 Jul, 01:00 AM
VS
World Cup