


চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির হিড়িক পড়েছে। গত দেড় মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৯টি ট্রান্সফরমার চুরির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একই রাতে পাশাপাশি দুটি এলাকায় চারটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
সর্বশেষ বুধবার দিবাগত রাতে ছেংগারচর পৌর এলাকার দেওয়ানজীকান্দি ও জীবগাঁও এলাকায় আরও দুটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যাওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে ট্রান্সফরমারের নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক টাকা জমা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের গ্রাহকদের অনেকেই টাকা জোগাড় করতে না পেরে দিনের পর দিন বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
তবে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামানের হিসাবে, চলতি ক্যালেন্ডার বছরে এ জোনের আওতাধীন এলাকায় মোট ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী জুলাই মাসে ১৩টি এবং আগস্ট মাসে আরও ৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
গত ৩১ জুলাই দিবাগত রাতে উপজেলার ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের নাউরি ও ফৈলাকান্দি এলাকায় পাশাপাশি স্থানে এক রাতেই চারটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়। সকালে স্থানীয় গ্রাহকরা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে ট্রান্সফরমার চুরির আলামত দেখতে পান।এছাড়া দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রাম, সুলতানাবাদ ইউনিয়নের দাসের বাজারসহ উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায়ও নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনে দেরি হওয়ায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়েছে গ্রাহকদের।
সর্বশেষ বুধবার (১২ আগস্ট) দিবাগত রাতে ছেংগারচর পৌর এলাকার দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের বাইতুননুর জামে মসজিদের পাশের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে একটি ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে জীবগাঁও গ্রামের দক্ষিণ দিকে ইব্রাহীম আখনের বাড়ির সামনে থেকেও আরেকটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
এতে দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের বাইতুলনুর জামে মসজিদসহ আশপাশের অর্ধশতাধিক আবাসিক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মসজিদের সাধারণ সম্পাদক বোরহানউদ্দিন ডালি বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যাওয়ায় মসজিদের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এতে মুসল্লিদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। দ্রুত নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় গ্রাহক তোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল হান্নান ও শুক্কুর আলী জানান, এলাকার অধিকাংশ গ্রাহকই নিম্নআয়ের মানুষ। ট্রান্সফরমার চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য অর্ধেক টাকা দেওয়ার শর্ত তাদের জন্য বড় চাপ। টাকা জোগাড় করতে না পারায় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।
পরে বিষয়টি স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসকে জানানো হলে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক টাকা গ্রাহকদের জমা দিতে বলা হয়। একদিন পেরিয়ে গেলেও টাকা জোগাড় করতে না পারায় এসব এলাকার অনেক গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনো এলাকায় প্রথমবার ট্রান্সফরমার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের অর্ধেক টাকা গ্রাহকদের বহন করতে হয়। একই ট্রান্সফরমার পরবর্তীতে আবার চুরি হলে অনেক ক্ষেত্রে পুরো মূল্যই গ্রাহকদের বহন করতে হচ্ছে।
১০ কেভিএ ক্ষমতার একটি ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, ১৫ কেভিএর প্রায় ১ লাখ টাকা এবং ২৫ কেভিএর প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমারের টাকা জোগাড় করা নিম্নআয়ের গ্রাহকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা মূল্যবান তামার কয়েল ও ক্যাবেলই চোরচক্রের মূল লক্ষ্য। ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাওয়ার পর ভেতরের তামার তার ও অন্যান্য মূল্যবান অংশ খুলে ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. নাঈম বলেন, যারা ট্রান্সফরমার চুরি করছে, তারা বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজে অবশ্যই অভিজ্ঞ। কারণ লাইনে বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায় তারা ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে বলে তারা ধারণা করছেন। চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করে পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রত্যন্ত ও নির্জন স্থান থেকে ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। পরে এগুলো ভাঙারি পট্টিতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
তিনি জানান, ট্রান্সফরমার চুরির প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গ্রাহকদের সচেতন করতে প্রত্যন্ত এলাকায় মাইকিং, উঠান বৈঠক, বিশেষ সভা ও গণশুনানিও করা হচ্ছে।
ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে ট্রান্সফরমার চোরদের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক গ্রাহক লোডশেডিং মনে করে বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। এই সুযোগে চোরেরা ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত অ্যালার্মিং। গ্রাহকদের সচেতন করা ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলার বিকল্প নেই।
তীব্র লোডশেডিং প্রসঙ্গে ডিজিএম বলেন, মতলব উত্তর জোনাল অফিস নিজস্বভাবে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করে না। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। মতলব উত্তরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৭ মেগাওয়াট হলেও কখনো ৮, কখনো ১০, ১২ কিংবা ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়েই লোড নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।
ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, এটি জাতীয় সমস্যা। আমাদের হাতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইচ্ছা করলেই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।
গ্রাহকদের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও একই সংকটের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। দিন-রাত গ্রাহকদের ফোন ও অভিযোগ সামলাতে হচ্ছে। গ্রাহক যেমন বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে আছেন, আমরাও এর বাইরে নই। আমরাও অন্ধকারে থাকি বলেন তিনি।
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ইদানীং ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে থানার ওসির সঙ্গে কথা হয়েছে এবং রাতের টহল টিম বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, এলাকাবাসীকেও সচেতন হতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক ব্যক্তির চলাফেরা দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।