

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার কালিরবাজার এলাকায় ধনাগোদা নদী এখন কার্যত অচল। কচুরিপানার ভয়াবহ জমাট, অবৈধ জাগ স্থাপন ও দখলদারিত্বের কারণে গত চার মাস ধরে এ নদীতে নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো, সেই সাঁকো দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
কালিরবাজার নৌকা ঘাটসংলগ্ন ধনাগোদা নদীতে সরেজমিনে দেখা গেছে, কচুরিপানায় পুরো নদী ঢেকে গেছে। নৌকা চালানোর মতো খোলা পানির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। একসময় যেখানে নিয়মিত লঞ্চ ও নৌযান চলত, সেখানে এখন মানুষ হাঁটছে কচুরিপানার উপর দিয়ে কিংবা বাঁশের সাঁকো ধরে।
এই নদীপথ দিয়েই মতলব উত্তরের ধনাগোদা তালতলী উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জের দাউদকান্দি উপজেলার মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা ও দাউদকান্দি, মতলব উত্তর, গজারিয়া তিন উপজেলার লোকজন নিয়মিত যাতায়াত করত। কিন্তু নদীতে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন দুই উপজেলার শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা মিলে নদীর দুই পাশে অর্ধেক অর্ধেক করে বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছে।
শ্রী রায়েরচর ব্রিজ থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত ধনাগোদা নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভয়াবহ কচুরিপানা জমাট বেঁধেছে। এই অংশে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে নৌ চলাচল।
একই সঙ্গে অচল হয়ে পড়েছে নদীপথের অন্তত ৮টি লঞ্চঘাট। ফলে মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ এবং পাশ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া ও দাউদকান্দি উপজেলার সঙ্গে নৌ যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধনাগোদা নদীর দুই পাড়ে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে জাগ (মাছ ধরার ফাঁদ) বসানো হয়েছে। এর ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কচুরিপানা সরে যেতে না পেরে নদীতে জমাট বেঁধে নদীকে পরিণত করেছে সবুজ মরুভূমিতে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও নিয়মিত খননের অভাব। ফলে নদীটি দিন দিন ভরাট হয়ে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌ যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র। এই নদীপথ দিয়েই ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য আনা নেওয়া হতো। কিন্তু দখল, দূষণ, অবৈধ জাগ ও কচুরিপানার আগ্রাসনে সেই নদী আজ শুধু স্মৃতির অংশ বাস্তবে পরিণত হয়েছে চলাচল অনুপযোগী এক মৃত জলধারায়।
সেই সাঁকো দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে শিক্ষার্থীরা একদিকে নদীর বুকে কচুরিপানার সাগর, অন্যদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল। মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, নৌকা না থাকায় প্রতিদিন স্কুলে যেতে আমাদের বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতে হয়। বৃষ্টি বা ভোরে কুয়াশার সময় খুব ভয় লাগে। তবুও উপায় নেই।
কালিরবাজার এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেন, নদীটা আমাদের জীবনরেখা ছিল। এখন সেই নদী কচুরিপানার জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন যদি আগে ব্যবস্থা নিত, আজ শিক্ষার্থীদের বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতে হতো না।
স্থানীয়রা দ্রুত ধনাগোদা নদী খনন, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ, কচুরিপানা পরিষ্কার এবং দখলমুক্ত করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায় নদী বাঁচলে বাঁচবে জনপদ, নইলে ধনাগোদা হয়ে যাবে আরেকটি মৃত নদীর নাম।
মতলব উত্তর প্রেসক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম বলেন, ধনাগোদা নদী আজ অবহেলা আর দখলদারিত্বের শিকার হয়ে মরতে বসেছে। বছরের পর বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনছি, কিন্তু বাস্তব কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখি না। অবৈধ জাগ, কচুরিপানার আগ্রাসন আর খননের অভাবে নদী আজ নৌপথ নয়, মানুষের দুর্ভোগের নাম। অবিলম্বে কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ ও নদী খননের কাজ শুরু না হলে কঠোর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবো।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ নিয়ে আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন
