

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কেউ মেশিনে আখ মাড়াইয়ে ব্যস্ত, কেউ রস নিয়ে ঢালছেন জাল দেওয়ার পাত্রে। বরিশালের বাবুগঞ্জে রমজান মাসকে সামনে রেখে আখের গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন আখচাষীরা। কয়েক যুগ ধরে উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামাঞ্চলের মানুষ গুড় তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শীতের মাস থেকে শুরু হয় আখের রস দিয়ে গুড় তৈরির কাজ। চলে পুরো রমজান মাসজুড়ে। তৈরি গুড় বাজারে বিক্রি করে যা লাভ হয়, তা দিয়েই সংসার চালান গ্রামের অধিকাংশ পরিবার।
জানা গেছে, প্রথমে আখ কাটার পর সেই পাতা ও আখের অবশিষ্ট অংশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় গৃহপালিত পশুর খাবার হিসেবে। এরপর রাখা আখ থেকে চাষীরা একটি মেশিনের মাধ্যমে রস বের করেন। পাশাপাশি কয়েকটি বিশাল চুলার ওপর চাপানো থাকে বড় মাপের লোহার কড়াই। তাতেই আখের রস ঢেলে জ্বাল দেওয়া হয়। চুলার ওপর টগবগ করে ফুটতে থাকে আখের রস। রস লাল হয়ে এলে এক চুলা থেকে আরেক চুলায় নেওয়া হয়। সেই কড়াইয়ের দিকে সজাগ নজর থাকে চাষীদের।
আখ মাড়াইয়ের পর অবশিষ্ট অংশকেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে চাষীরা প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা রস জ্বাল দেন। পরে তা চুলা থেকে নামিয়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট রাখলে শক্ত হয়। পুরো দমে জ্বাল এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় অনবরত নাড়ার মাধ্যমে এভাবেই তৈরি করা হয় আখের রস থেকে খাঁটি ও সুস্বাদু গুড়। দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসেন গরম গুড় কিনতে। সুস্বাদু ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় বাবুগঞ্জের গুড় সবার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বাবুগঞ্জ উপজেলায় এ বছর আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আখ চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লাভবান হবেন আখচাষীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, চাষীরা একটি মেশিনের মাধ্যমে রস বের করছেন এবং কড়াইয়ে ঢেলে জ্বাল দিচ্ছেন। পরে তা চুলা থেকে নামিয়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট রাখলে শক্ত হয়। এরপর চাষীরা হাতের সাহায্যে শক্ত গুড়গুলোকে নির্দিষ্ট আকার দেন। এভাবেই তৈরি করা হয় সুস্বাদু গুড়।
গুড় প্রস্তুতকারী মো. সামিম হাওলাদার এনপিবি নিউজকে বলেন, “আমরা বিভিন্ন ফসল চাষ করি। কিন্তু আখের প্রতি আমাদের আলাদা টান রয়েছে। আমি নিজে ৫০ বছর ধরে আখ চাষ করে গুড় তৈরি করছি। তার আগে আমার বাবা-দাদারাও করতেন। এ বছর ৩০ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছি। সরকার থেকে কিছু সহায়তা পেয়েছি। গুড় তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায়। আখ ও গুড় একসঙ্গে বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এতে আমরা লাভবান হচ্ছি।”
আরেক গুড় প্রস্তুতকারী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “এখান থেকে প্রতিদিন ৯ পাক গুড় তৈরি হয়। আমরা নিজেরাই গুড় তৈরি করি। এটি খুব সুস্বাদু ও জনপ্রিয়। বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যান। আমরা ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। আমাদের গুড়ে কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। গুড় তৈরি করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তবে দ্রুত বিক্রি হয়ে যাওয়ায় কষ্টটা সার্থক হয়। আমরা অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও গুড় বিক্রি করি।”
আখচাষী মেখলেচুর রহমান বলেন, “আমরা পাওয়ার টিলারের ইঞ্জিনের মাধ্যমে গুড় তৈরি করি। আলাদা কোনো শ্রমিক লাগে না; পরিবারের সদস্যরা মিলে কাজটি করি। বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চালাই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি আখ মাড়াইয়ের কল স্থাপন করে দিলে আমাদের খরচ কমবে এবং আগ্রহ বাড়বে।”
স্থানীয় আখচাষীরা জানান, এখানকার গুড় নির্ভেজাল ও খাঁটি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চাষে খরচ কম ও তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর আখের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে কৃষি অফিসের আরও সহযোগিতা পেলে উপজেলায় আখ ও গুড়ের উৎপাদন বাড়বে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ এনপিবি নিউজকে বলেন, “বরিশাল জেলার মধ্যে বাবুগঞ্জ উপজেলায় আখ বেশি উৎপাদিত হয়। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আখ চাষ হয়েছে। কৃষি প্রণোদনার মাধ্যমে চাষীদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অনেক জেলায় সরকারের চিনিকল রয়েছে, কিন্তু এই অঞ্চলে কোনো চিনিকল নেই। স্থানীয় চাষীদের চাহিদার ভিত্তিতে সরকারের কাছে চিনিকল স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হবে।”
মন্তব্য করুন
