

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার করমজল মোংলা শহর থেকে নদীপথে মাত্র প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। পশুর নদী পেরিয়েই পৌঁছানো যায় সুন্দরবনের ওই অংশে। সুন্দরবনের এত কাছে মোংলা শহরের ব্যস্ত সড়কে এবার দেখা মিলেছে এমন এক হনুমানের, যার স্বাভাবিক বিচরণ এই এলাকায় নয়।
রোববার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে মোংলা বন্দরসংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি বটগাছের ডালে দেখা যায় ধূসর রঙের হনুমানটিকে। নিচ দিয়ে তখন পথচারীদের ব্যস্ত চলাচল। কেউ বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছেন, কেউ গাড়ির অপেক্ষায়। আর তাঁদের মাথার ওপর গাছের মোটা ডালে বসে নিশ্চিন্তে রুটি খাচ্ছিল হনুমানটি।
মাঝে মধ্যে খাওয়া থামিয়ে নিচের মানুষের দিকে তাকাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর আবার মন দিচ্ছিল খাবারে। মানুষের উপস্থিতি নিয়ে যেন তার কোনো আগ্রহই নেই।
বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, হনুমানটি মুখপোড়া হনুমান বা কমন ল্যাঙ্গুর (Semnopithecus entellus) বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধূসর শরীর, কালো মুখ ও হাতের পাতার এই প্রজাতির হনুমান দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর ও কেশবপুর এলাকায় বেশি দেখা যায়।
তাহলে স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রের বাইরে সুন্দরবনের এত কাছে মোংলার ব্যস্ত এলাকায় এই হনুমানটি এলো কীভাবে?
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিন আগে মোংলা বন্দরসংলগ্ন এলাকায় একসঙ্গে দুটি হনুমানকে দেখা গিয়েছিল। কখনো গাছের ডালে, কখনো রাস্তার পাশে, আবার কখনো কলাবোঝাই ট্রাকের ওপরও দেখা যায় তাদের।
স্থানীয়দের দাবি, পরে ওই দুটি হনুমানের একটি ট্রাকের চাপায় মারা যায়। মোংলার একটি এলপি গ্যাস ফ্যাক্টরির গেটের কাছে নারী হনুমানটির মৃত্যু হয় বলেও তাঁরা জানান। তবে মৃত হনুমানটির কোনো ছবি বা ঘটনার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি স্থানীয়দের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এখন যে হনুমানটি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটিকে স্থানীয়দের কেউ কেউ পুরুষ হনুমান বলে মনে করছেন। তাঁদের ধারণা, দুটি হনুমান একসঙ্গেই এলাকায় এসেছিল। একটি মারা যাওয়ার পর অন্যটিকেই এখন বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে।
তবে হনুমান দুটি জোড়া ছিল কি না কিংবা একটি মারা যাওয়ার পর অন্যটি তাকে খুঁজছে কি না, এমন কোনো তথ্য নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।
মোংলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনিরুল হায়দার ইকবালের ধারণা, যশোরের কেশবপুর এলাকা থেকে কোনো কলাবোঝাই ট্রাকে চড়ে হনুমানটি মোংলায় এসে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, কেশবপুর ও আশপাশের এলাকায় এই প্রজাতির হনুমানের বিচরণ রয়েছে। ওই এলাকা থেকে বিভিন্ন পথে কলাবোঝাই ট্রাক মোংলায় আসে। কোনো একটি ট্রাকে উঠে অজান্তেই হনুমানটি এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে আসতে পারে।
তবে এটিকে নিশ্চিত তথ্য নয়, সম্ভাব্য কারণ হিসেবেই দেখছেন তিনি।
বন্যপ্রাণী নিয়ে প্রায় ৩৯ বছর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রবের। তাঁর অভিজ্ঞতাও বলছে, কলাবোঝাই গাড়ির সঙ্গে হনুমান এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে আসতে পারে।
তিনি জানান, নতুন কোনো এলাকায় পৌঁছে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে প্রাণীটি ঘুরে বেড়াতে পারে। কোনো প্রাণী সঙ্গী হারালে তার আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে অস্থিরতা বা বিচ্ছিন্নভাবে ঘোরাফেরার মতো আচরণ দেখা যেতে পারে। তবে মোংলায় ঘুরে বেড়ানো এই হনুমানটি সঙ্গী হারানোর কারণে এমন আচরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
আব্দুর রব আরও বলেন, বন্যপ্রাণীর আচরণকে মানুষের প্রেম বা বিরহের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। খাবার, আশ্রয়, নিরাপত্তা কিংবা অপরিচিত পরিবেশে পথ হারিয়েও কোনো বন্যপ্রাণী একই এলাকায় ঘুরে বেড়াতে পারে।
তাই আপাতত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, কীভাবে এই মুখপোড়া হনুমানটি মোংলায় এসেছে। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে কলাবোঝাই ট্রাকে করে কেশবপুর থেকে আসার বিষয়টি সামনে থাকলেও অন্য কোনো এলাকা থেকে মানুষের অজান্তে চলে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রোববার সকালে বটগাছের ডালে বসে রুটি খাওয়া হনুমানটি একসময় উঠে দাঁড়ায়। চারপাশে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চলে যায় অন্যদিকে। নিচে তখনও মানুষের ব্যস্ততা, গাড়ির চলাচল আর বাসস্ট্যান্ডের ভিড়।
কয়েক দিন আগে একই এলাকায় দুটি হনুমানকে দেখা গিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে একটিকে। একটির পরিণতি সম্পর্কে স্থানীয়দের বক্তব্য পাওয়া গেলেও বেঁচে থাকা এই মুখপোড়া হনুমানটি ঠিক কীভাবে মোংলায় এসে পৌঁছাল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।