

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বরিশালে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ২৫-৩০ শতাংশ শিশু ও কিশোরের দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
তাদের ভাষ্য, শিশুদের মধ্যে বাড়তে থাকা মায়োপিয়া বা স্বল্পদৃষ্টির অন্যতম কারণ দীর্ঘ সময় স্মার্টফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা। এ পরিস্থিতির জন্য অভিভাবকদের অসচেতনতাকেও দায়ী করছেন তারা।
মায়োপিয়া বা স্বল্পদৃষ্টি হলো চোখের এমন সমস্যা, যেখানে কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের বস্তু ঝাপসা লাগে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
মা-বাবার একজন বা দুজনেরই মায়োপিয়া থাকলে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দীর্ঘ সময় ডিজিটাল স্ক্রিন বা বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে, মুঠোফোন, ট্যাব, কম্পিউটার ও বই পড়ার সময় বেশি হলে চোখের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। সূর্যের আলোয় কম সময় কাটানো ও ঘরের কৃত্রিম আলোয় বেশি সময় থাকলেও মায়োপিয়া হয়। পড়ার সময় চোখ ও বইয়ের দূরত্ব ঠিক না রাখা, চোখে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ ইত্যাদি কারণে হয়।
সম্প্রতি বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অনেক শিশুর হাতেই মোবাইল ফোন। কেউ ইউটিউব দেখছে, কেউবা মোবাইল গেম খেলছে। শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডে রোগী বা স্বজনদের সঙ্গে আসা অনেক শিশুকেও মোবাইলে সময় কাটাতে দেখা যায়।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশুদের একটি বড় অংশ অবসর সময় মোবাইল ফোনে কাটাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল না দিলে শিশুরা খেতেও চায় না।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশির দাস চিকিৎসার জন্য এসেছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনি বলেন, স্কুল শেষে বেশির ভাগ সময় ঘরেই থাকতে হয়। বিকেলে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার কারণে খেলাধুলার সুযোগ খুব কম। তাই অবসর সময়ে ইউটিউব দেখা ও গেম খেলা তার নিয়মিত অভ্যাস। এতে চোখে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
অভিভাবকরা বলেন, মোবাইল ছাড়া আমার ছেলে ভাত খেতে চায় না। তাকে মোবাইল দিতে হয়, তারপর খায়। এখন অভ্যাসটা বদলানোর চেষ্টা করছি।
তারা বলেন, শহরে শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই। যেসব মাঠ আছে, সেখানে যাতায়াতেও খরচ হয়। তাই সব সময় শিশুদের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবে তিনি মেয়ের মোবাইল ব্যবহারের সময় কমানোর চেষ্টা করছেন বলে জানান।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগীদের ওপর সম্প্রতি করা একটি পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের ২৫-৩০ শতাংশ শিশু-কিশোর মোবাইল আসক্তিজনিত কারণে দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বলেন, শিশুদের মোবাইল আসক্তি শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগের অভাব এবং পরিবারে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ না পাওয়াও এ সমস্যার কারণ।
তিনি বলেন, শুধু চিকিৎসা দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রতিদিন হাসপাতালে আসা শিশু রোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের চোখের সমস্যার সঙ্গে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে।
হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বলেন, শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই উচ্চমাত্রার চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। দূরের বস্তু স্পষ্টভাবে দেখতে না পারার এই সমস্যার অন্যতম কারণ দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার।
তিনি আরও বলেন, অনেক অভিভাবক শিশুকে খাওয়ানো বা শান্ত রাখার জন্য মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেন। এতে শিশুরা যেমন আসক্ত হয়ে পড়ে, তেমনি তাদের চোখের সমস্যাও বাড়ে। মায়োপিয়া হলে চশমা ছাড়া স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই শিশুদের মোবাইল ব্যবহারে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।
