

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কক্সবাজারের রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে ছায়ার মতো বিস্তৃত এক মাদক ও চোরাচালান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অবশেষে দৃশ্যমান অভিযান চালিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও বহুল আলোচিত সীমান্ত মাফিয়া নজরুল ইসলাম।
ডিবি পুলিশের অভিযানে তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা। এ সময় আটক করা হয়েছে নজরুলের স্ত্রী ছালেহা বেগম (৪৫) এবং রোহিঙ্গা যুবক মো. হাসিম ওরফে ওসমানকে (৩৫)। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায় আরও ৩ থেকে ৪ জন সন্দেহভাজন মাদক কারবারি।
আটক ছালেহা বেগম রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের হাজীরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। অপরদিকে আটক হাসিম উখিয়ার থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৩ এর বাসিন্দা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি কেবল একটি ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং বহু বছর ধরে সীমান্তজুড়ে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর মাদক সাম্রাজ্যের ক্ষুদ্র অংশ উন্মোচিত হয়েছে মাত্র।
কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং মিয়ানমারঘেঁষা বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় নজরুলকে স্থানীয়রা বহুদিন ধরেই 'সীমান্তের রাজা' হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার হাত ধরেই প্রথম দিকে মিয়ানমার থেকে গরু, ইয়াবা এবং বিভিন্ন চোরাই পণ্যের বড় চালান প্রবেশ করতে শুরু করে।
একসময় সাধারণ জীবনযাপন করা নজরুল অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। সীমান্ত বাণিজ্য, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিনি শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নজরুল ধীরে ধীরে পুরো সীমান্ত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেন। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নজরুলের প্রভাব কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সীমান্তের চোরাকারবার, ইয়াবা পাচার ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হয়।
একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'নজরুলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস অনেকের নেই। তার চোরাচালান সম্রাজ্য নিয়ে কথা বলতে গেলে কয়েকদিন লাগবে। সীমান্ত এলাকায় তার শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ আছে বলে মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে।'
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, 'মাঝে মধ্যে অভিযান হয়, কিন্তু মূল হোতারা ধরা পড়ে না। যারা মাঠে কাজ করে তারাই আটক হয়। বড়রা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।'
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সীমান্তভিত্তিক ইয়াবা পাচারে স্থানীয় সিন্ডিকেটের সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক নেটওয়ার্কেরও শক্তিশালী সংযোগ রয়েছে। আটক রোহিঙ্গা যুবক হাসিম সেই নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবহার করে ইয়াবা প্রবেশের পর তা প্রথমে কচ্ছপিয়া-গর্জনিয়া করিডোরে মজুদ করা হয়। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিএনপি নেতা নজরুলের নেতৃত্বে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সুবিধাভোগী, দালাল ও চোরাকারবারি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে।
পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশের একটি দল কচ্ছপিয়ার হাজীরপাড়া এলাকায় নজরুলের বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করলে ধাওয়া দেওয়া হয়। পরে বাড়ির বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালিয়ে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় নজরুলের স্ত্রী ও এক রোহিঙ্গা সহযোগীকে। তবে অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যায় আরও কয়েকজন।
সচেতন মহলের মতে, সীমান্তে ইয়াবা কারবার এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের পেছনে থাকা অর্থের প্রবাহ, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা তদন্ত না করলে সীমান্তে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মো. মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আটক নারী ও পুরুষের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।