

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রেলওয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এসআরভি স্টেশনের কোটি টাকা মূল্যের জমি গোপনে লিজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ‘উৎস ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের ভূ-বরাদ্দ নীতিমালা ২০২০-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী, স্টেশন এলাকায় জায়গা বরাদ্দ পেতে হলে আবেদনকারীকে প্রকৃত রেল ব্যবহারকারী হতে হয়। আর এমন ব্যবহারকারী না পাওয়া গেলে বাধ্যতামূলকভাবে উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে লিজ দিতে হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব শর্ত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গোপনে বরাদ্দ সম্পন্ন করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি উৎস ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ৬ হাজার বর্গফুট জমির জন্য আবেদন করে। এরপর অস্বাভাবিক দ্রুততায় ৪৫০০ বর্গফুট জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ২১ অক্টোবর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা তৌষিয়া আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে লাইসেন্সধারী এস এম এ মোসাব্বিরকে ২৭,০১,৪৪০ টাকা লাইসেন্স ফি জমা দিতে বলা হয়।
নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবেই প্রকৃত রেল ব্যবহারকারী নয়। তবুও টেন্ডার ছাড়াই বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত রিপোর্ট ও নকশায়ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই নথি অনুমোদনের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ আছে, এ ঘটনায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কিছু সদস্য ও সাবেক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরাসরি এই লিজ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া সরাসরি মধ্যস্থতা করেছেন এসআরভি স্টেশনের বর্তমান দায়িত্বে থাকা হাবিলদার পংকজ রায়।
অভিযোগ রয়েছে, লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িত এবং মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এমনকি শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরোক্ষ প্রশ্রয়ের কথাও উঠে এসেছে।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও রেলওয়ের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে, সত্য প্রকাশ্যে আসার পরও তড়িঘড়ি করে এই অবৈধ বরাদ্দ বুঝিয়ে দিতে কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নতুন করে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি পুরো অবৈধ প্রক্রিয়াকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ স্পষ্ট, সেখানে এখনো কেন কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি? কার নির্দেশে এবং কোন ক্ষমতাবলে তদন্ত ছাড়াই এই বরাদ্দ বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে?
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এ ধরনের অনিয়ম রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ এবং এতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তারা দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উৎস ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষে লাইসেন্সধারী এস এম এ মোসাব্বির বলেন, ‘আমাকে সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম হলে সেটি রেলওয়ের দায়। আপনারা রেলওয়ের সাথে যোগাযোগ করুন।’
অন্যদিকে, প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, ‘সব ক্ষেত্রে সবার স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক নয় এবং কিছু ক্ষেত্রে গোপন টেন্ডারের সুযোগ রয়েছে।’
তবে নীতিমালার ৩১ ধারা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমার জানামতে নিয়ম মেনেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে নথিতে স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টি আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’
এদিকে বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) ও বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য করুন