

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজানের সন্ধ্যা। সূর্য ডোবার আগে অপেক্ষা, তারপর আজানের সুরে ইফতার। কিন্তু সবার ভাগ্যে কি এক রকম আয়োজন জোটে? কক্সবাজারে সেই প্রশ্নের মানবিক এক উত্তর দিল দরিয়াপারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস লিমিটেড (হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট)।
বুধবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যায় হোটেলের শাহসুজা হলরুমে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী এক ইফতার মাহফিল। জেলার বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানার শতাধিক এতিম ও হেফজখানার শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী সেখানে অতিথি হিসেবে অংশ নেয়। কর্পোরেট পরিবেশে, সজ্জিত টেবিলে, সম্মানের সঙ্গে বসে তারা ইফতার করে- যেন তারাও এ শহরেরই সমান অংশ।
এতিম অতিথিদের দেখভালে ছিলেন হোটেলের পরিচালক আবদুল কাদের মিশুসহ কর্মকর্তারা। শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে, নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করে তারা জানান দেন- এ আয়োজন কেবল দায়সারা নয়, হৃদয়ের।
আবদুল কাদের মিশু বলেন, রমজান আমাদের সংযম, সহমর্মিতা ও বৈষম্যহীনতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু রোজার শেষভাগে অনেক এতিমখানায় এক নিঃশব্দ কষ্টের ছবি দেখা যায়। বাবা-মা না থাকায় অনেক শিশু প্রতিষ্ঠানেই থেকে যায়। ঈদের ছুটিতে যখন অন্যরা বাড়ি ফিরে যায়, তখন কেউ কেউ নিরবে কাঁদে।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে এসব দেখেছি। আমার বাবা-মাও এতিমদের খোঁজ নিতেন। দানশীলদের সহযোগিতায় এতিমখানায় সাধারণ ইফতার হয় ঠিকই, কিন্তু দামি হোটেলে অতিথি হয়ে বসে খাওয়ার সুযোগ তাদের ক’জনের হয়? আমরা সারা বছর পর্যটকদের সেবা দিই। রমজানে পর্যটক কম থাকে- সেই সময়টায় আশপাশের এতিম ও হেফজখানার শিশুদের অতিথি করার চেষ্টা করি। হোটেলের চেয়ারম্যান এম এন করিমের নির্দেশে প্রায় এক যুগ ধরে এ উদ্যোগ নীরবে চলছে।
আদর্শগ্রাম এলাকার এতিমখানার পরিচালক মাওলানা ইরফান উল্লাহ বলেন, ঈদের ছুটিতে একদল শিশুকে কেউ নিতে আসে না। কারো বাবা-মা নেই, কারো বাবা নেই, মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়েছে। অনেকের মা নেই, বাবা খোঁজ রাখেন না। যারা ভাগ্যবান, তাদের স্বজনরা নিয়ে যায়। বাকিরা নিঃশব্দে শূন্যতা অনুভব করে। সহপাঠীরা যখন বাড়ি যায়, তখনই তাদের ছোট্ট মনে এতিম হওয়ার বেদনা তীব্র হয়ে ওঠে। এমন একটি আয়োজন তাদের মনে অন্যরকম আনন্দ জাগায়।
হোটেলের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক মো. মাহবুব ইসলাম জানান, শুধু ইফতার নয়- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাতেও শতাধিক এতিম শিশু-কিশোরকে হোটেলে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। বিরিয়ানি, পোলাও, মেজবানের আয়োজনসহ নানা খাবারের স্বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, আমাদের সবার মনে রাখা উচিত- আজ আমরা আছি, কাল না-ও থাকতে পারি। তখন আমাদের সন্তানও হয়তো এতিম হিসেবেই বড় হবে।
খুদে অতিথিরা জানায়, চলতি রমজানের বেশিরভাগ দিন তারা চনা-মুড়ি ও শরবত খেয়েই ইফতার করেছে। কিন্তু এদিনের আয়োজন ছিল একেবারে ভিন্ন। বিফ হালিম, জিলাপি, খেজুর, আনারস, তরমুজ, আঙুর, মুরগির কাবাব, পেঁয়াজু, বেগুনি, পেপের জুস- বহু পদের ইফতার সাজানো ছিল তাদের সামনে। মাগরিবের নামাজের পর পরিবেশন করা হয় বিফ তেহেরি, সালাদ ও ঠান্ডা পানীয়।
ইয়াছিন নামের একজন কিশোর বলল, কোরবানির ঈদেও আমরা এখানে গরুর মেজবান খেতে আসি। তারা আমাদের মূল্য দেয়। আল্লাহ যেন তাদের উত্তম প্রতিদান দেন।
ইফতার পার্টিতে হোটেলের হিসাব বিভাগ প্রধান মোহাম্মদ আলমগীর, বিপণন বিভাগের ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নুর সুমেল, প্রকৌশলী আরাফাত, হাউসকিপিং ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হোসাইন, ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সহকারী ব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম, সিকিউরিটি ইনচার্জ মো. জালাল উদ্দিন, জনসংযোগ কর্মকর্তা সাংবাদিক সায়ীদ আলমগীর, আইটি বিভাগের কর্মকর্তা জিসানসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শিশু-কিশোর অতিথিদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।
এতিম শিশু-কিশোরদের মতে, সন্ধ্যার সেই আয়োজনে শুধু খাবার পরিবেশন হয়নি; পরিবেশন হয়েছে আন্তরিকতা, সম্মান আর আপন করে নেওয়ার এক গভীর অনুভূতি।
সাজানো টেবিলে বসে অতিথির মর্যাদায় ইফতার করার অভিজ্ঞতা হয়তো তাদের জীবনের ছোট কিন্তু উজ্জ্বল এক স্মৃতি হয়ে থাকবে। এক টুকরো আনন্দ, কিছুটা স্বীকৃতি আর হৃদয়ছোঁয়া যত্ন- এই সন্ধ্যাটি হয়তো অনেক দিন ধরে তাদের মনে আলো হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন