

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, নতুন জীবনের স্বপ্ন আর আনন্দঘন পরিবেশ- সবকিছুই স্বাভাবিক গতিতেই এগোচ্ছিল। কিন্তু বাসর রাতে কনে মুখ ধোয়ার পরই পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
বর রায়হান কবিরের দাবি, যাকে বিয়ের আগে দেখানো হয়েছিল, বাসরঘরে তার পাশে বসা নারী সেই ব্যক্তি নন। এই অভিযোগ ঘিরেই মুহূর্তে বিয়ের আনন্দ রূপ নেয় সন্দেহ, উত্তেজনা এবং শেষ পর্যন্ত আইনি জটিলতায়।
ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘কনে বদল’ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। বিয়ের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত কারাগারে যেতে হয় বরকে।
জানা গেছে, গত বছরের ১ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের সঙ্গে রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডার এলাকার বাসিন্দা জিয়ারুল হকের মেজো মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বিয়ের রাতেই বর ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কনে বদলের অভিযোগ তোলা হয়। বিষয়টি সমাধানের জন্য দুই পক্ষ একাধিকবার আলোচনায় বসলেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এরপর গত বছরের ২৭ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক বর রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও আদালতে মামলা করেন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবির কনের বাবা জিয়ারুল হক ও ঘটক মোতালেবের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
উভয়পক্ষের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আদালত রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বর রায়হান কবিরের মামা বাদল অভিযোগ করে সাংবাদিকদের বলেন, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে রায়হানের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। জুলাই মাসের শেষের দিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে ঘটক একটি মেয়েকে দেখান।
মেয়েটিকে পাত্র ও উপস্থিত স্বজনদের পছন্দ হলে তা ঘটককে জানানো হয়। পরবর্তীতে মেয়েপক্ষের লোকজন ছেলেপক্ষের বাড়িতে এসে আত্মীয়তার প্রস্তাব দেয় এবং নতুন করে মেয়ে না দেখিয়েই বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করার অনুরোধ জানায়। তাদের দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করার তাগিদও ছিল বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, রায়হান কবিরের দুলাভাই মানিক মালয়েশিয়া প্রবাসী। তিনি দ্রুত বিদেশে ফিরে যাবেন। এ কারণে আমরা বিয়ের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে চেয়েছিলাম। ১ আগস্ট রাত ১১টায় দুটি মাইক্রোবাসে করে আমরা মেয়ের বাড়িতে যাই। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ভোর ৪টার দিকে বাড়ি ফিরি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, অতিরিক্ত মেকআপের কারণে বিয়ের রাতে কনে পরিবর্তনের বিষয়টি আমরা বুঝতে পারিনি। তবে বাসর রাতে মেয়ে মুখ ধোয়ার পর রায়হান বুঝতে পারে, সে যে মেয়েকে বিয়ে করেছে সে অন্য কেউ।
যে মেয়েকে আগে দেখানো হয়েছিল, তাকে কৌশলে বদল করা হয়েছে। ২ আগস্ট আমরা মেয়েটিকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেই এবং প্রতারণার কারণ জানতে চাই। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ঘটক ও মেয়ের বাবা পরিকল্পিতভাবে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কনের বাবা জিয়ারুল হক বলেন, আমার কোনো ছেলে সন্তান নেই। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়ে জেমিন আক্তার রাণীশংকৈল মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।
মেজো মেয়েকে ছেলেপক্ষ আমাদের বাসায় এসে দেখে গেছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রী উপস্থিত ছিল। এমন অবস্থায় বিয়ের রাতে কনে বদল হয়েছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিয়ের আগে কোনো যৌতুকের কথা বলা হয়নি। কিন্তু বিয়ের পরদিনই তারা ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। আমি জমি বিক্রি করে দেওয়ার কথাও বলেছি, কিন্তু তারা সময় দিতে রাজি হয়নি। এখন আমাকে হেয় করার জন্য এসব মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
এ ঘটনায় ঘটক মোতালেব বলেন, আমি অন্য কোনো মেয়ে দেখাইনি। মেয়ে দেখানো হয়েছিল মেয়ের বাবার বাসাতেই। পরে তারা নিজেরাই দ্রুত বিয়ের প্রক্রিয়া শেষ করেছে। এরপরের ঘটনার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও ছেলেপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, ছেলেপক্ষের অভিযোগ মেয়েপক্ষ ও ঘটক মিলে কনে বদলের মাধ্যমে প্রতারণা করেছে।
প্রথম দিকে মীমাংসার শর্তে রায়হান কবির জামিনে ছিলেন। কিন্তু কোনো সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি এখন পুরোপুরি বিচারাধীন। আমরা আশা করছি আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।
মন্তব্য করুন
