সোমবার
০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঘন কুয়াশা ও সংকেতবাতির অভাবে চরম ঝুঁকিতে ঢাকা-বরিশাল নৌরুট

বরিশাল প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম
ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে চলাচল করা লঞ্চ
expand
ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে চলাচল করা লঞ্চ

ঘন কুয়াশা, ডুবোচর ও তীব্র নাব্যতা সংকটে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–বরিশাল নৌরুট এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শীত মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের ৩১টি নৌপথের মধ্যে অন্তত ২২টিতে পানির গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর মধ্যেই পর্যাপ্ত সংকেতবাতি, ভাসমান বয়া ও মার্কারের অভাবে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করছে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে।

বিশেষ করে রাতের বেলায় ঘন কুয়াশার মধ্যে নৌযান পরিচালনা করতে গিয়ে চালকদের পড়তে হচ্ছে চরম বিপাকে। ফলে নৌযান সংঘর্ষ, ডুবোচরে আটকে পড়া এবং প্রাণহানির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

চলতি শীত মৌসুমেই ঢাকা–বরিশাল নৌপথে মেঘনা নদীতে ঘন কুয়াশার কারণে একাধিক লঞ্চ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। গত ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ২টার দিকে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নীলকমল বাংলাবাজার এলাকায় ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি জাকির সম্রাট–৩ এর সঙ্গে বরিশালের ঝালকাঠিগামী অ্যাডভেঞ্চার–৯ লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন।

একই রাতে সদরঘাট থেকে প্রায় ৫০০ যাত্রী নিয়ে চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ইমাম হাসান–৫ লঞ্চটি মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুর এলাকায় নোঙর করা একটি বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যাত্রীদের মধ্যে। পরদিন মেঘনায় ডুবে থাকা বাল্কহেড থেকে ডুবুরিরা দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।

সদরঘাট নৌ-পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ওইদিনই ছোট-বড় অন্তত ১৪টি নৌযানের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর কিছুদিন আগেই একই নৌপথে ঘন কুয়াশার কারণে বরিশালগামী এম খান–৭ লঞ্চের সঙ্গে ঈগল–৪ লঞ্চের সংঘর্ষে দুটি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাণহানি হয়নি।

ঘন কুয়াশাজনিত সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাতে। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান–১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কুয়াশার কারণে লঞ্চটি তীরে ভেড়াতে না পেরে মাঝনদীতে চালকবিহীন ভাসতে থাকে। ওই ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৪৭ জনের মৃত্যু হয় এবং ৩১ জন নিখোঁজ হন।

বয়া ও সংকেতবাতির অভাবেই বাড়ছে ঝুঁকি

লঞ্চযাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বরিশাল নৌযাত্রী ঐক্য পরিষদ–এর আহ্বায়ক দেওয়ান আবদুর রশিদ বলেন, “রাত্রিকালীন নৌচলাচলের ক্ষেত্রে নদীর বাঁক, চর ও ডুবোচর এলাকায় বয়া, সংকেতবাতি ও মার্কার থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই বিষয়ে চরম অবহেলা চলছে। নিয়মিত সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ থাকলে বহু দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।”

চালকদের অভিযোগ: নাব্যতা সংকট তীব্রতর ঢাকা–বরিশাল রুটে চলাচলকারী লঞ্চ ও কার্গো জাহাজের মাস্টার ও চালকরা জানান, শীত মৌসুমে পানি কমা স্বাভাবিক হলেও এবার তা শুরু হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে আগেই। অনেক জায়গায় বয়া থাকলেও তাতে সংকেতবাতি জ্বলে না। কুয়াশার মধ্যে ডুবন্ত বা নোঙর করা বাল্কহেড বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এমভি মানামী লঞ্চের পরিদর্শক বেলাল হোসেন বলেন, “আগে নভেম্বর মাসে লঞ্চ ডুবোচরে আটকাতো। এবার অক্টোবর থেকেই সেই পরিস্থিতি শুরু হয়েছে।”

চালকরা আরও জানান, ঢাকা থেকে বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, আমতলী, মেহেন্দীগঞ্জ, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, চরফ্যাশন, বাউফল, ভান্ডারিয়া, হিজলা ও মুলাদীসহ বিভিন্ন নৌপথে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। ফেরি চলাচলেও মারাত্মক প্রভাব

নদীর নাব্যতা সংকট ও নতুন চর জেগে ওঠায় বরিশালের মীরগঞ্জ–মুলাদী ফেরি চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার করতে না পেরে বিকল্প ও দীর্ঘপথে ফেরি চলাচল করায় জ্বালানি ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী নবনীতা বিশ্বাস জানান, “হিজলা এলাকার নাব্যতা সংকট নিরসনে কাজ চলমান রয়েছে। হাইড্রোলজি বিভাগের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

এদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (নৌপথ) মো. আব্দুস সালাম বলেন, “চাঁদপুর ও বরিশাল বিভাগের প্রয়োজনীয় স্থানে বয়া, মার্কার ও সংকেতবাতি স্থাপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই এসব সমস্যার সমাধান হবে।”

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X