সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ পেতে উন্মুখ আরব বিশ্ব

শফিকুল ইসলাম শান্ত
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৭ পিএম
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সৌদি বাদশা
expand
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সৌদি বাদশা

এই মূহুর্তে পাকিস্তানের সমরভাণ্ডারে থাকা সবচেয়ে আকর্ষণীয় যুদ্ধবিমান জে এফ-১৭ থান্ডার। বেশ কয়েক বছর ধরেই ইসলামাবাদ তাদের তৈরি অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমান বিদেশে বিক্রি এবং এর প্রচারণা করে আসছে।

তবে, গেলো বছরের মে মাসে চিরশত্রু ভারতের সাথে চার দিনের সংঘাতে জড়ানোর পর জে এফ-১৭ এর জনপ্রিয়তা লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ওই সংঘাতে দারুণ নৈপূণ্য দেখায় যুদ্ধবিমানটি।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর বিশ্বজুড়ে এই যুদ্ধবিমানের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। আগে থেকে ককেশাস অঞ্চলের দেশ আজারবাইজান, পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দেশ নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মিয়ানমার পাকিস্তানের তৈরি এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে আসছে।

তবে, নতুন করে জে এফ-১৭-কে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে প্রভাবশালী আরব দেশ সৌদি আরব, সুদান এবং ইরাকও। আরব অঞ্চলের বাইরে এশিয়ার দুটি দেশ ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশও পাকিস্তানের এই যুদ্ধবিমান নিজেদের বহরে যুক্ত করার আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরব বিশ্বে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়ছে কেন?

বিশ্লেষকরা বলছেন—এতোদিন মিত্র আরব দেশগুলোর সেনা ও বিমান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়ে আসছিলো পাকিস্তান। কিন্তু ভারতের সাথে সংঘাতে ইসলামাবাদ যে সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেটি তাদের প্রশিক্ষক থেকে নিরাপত্তা সরবরাহকারী দেশে হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ সুগম করে দিয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডও পাকিস্তানের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।

এর বড় উদাহরণ আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি। ইসরায়েল কাতারে বোমা হামলা চালানোর মাত্র সপ্তাহখানেক পরই ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এই প্রতিরক্ষা চুক্তি করে রিয়াদ ও ইসলামাবাদ। চুক্তি অনুযায়ী— এর কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অপর দেশ সহায়তা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান পরমাণুশক্তিধর দেশ হওয়ায় এ ধরনের চুক্তিতে আগ্রহী হয় সৌদি আরব। যদিও সৌদির অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ ইউরোপীয় মিত্রদের তৈরি যুদ্ধবিমানও রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে তবুও জেএফ-১৭ এর প্রতি কেন ঝোঁক দেখাচ্ছে রিয়াদ?

এ বিষয়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সাবেক এয়ার কমোডর আদিল সুলতান আল জাজিরাকে বলেন, সৌদি আরব অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে আগে বড় কিছু শক্তির ওপর নির্ভর করতো। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ যখন পাল্টে যাচ্ছে, তখন বিকল্প উৎস থেকেও অস্ত্র ক্রয়ের পথে হাঁটছে তারা। এ ছাড়া পাকিস্তান সৌদি আরবের পুরোনো মিত্র। নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির পর দেশ দুটি নির্ভরযোগ্য অংশিদারে পরিণত হয়েছে। ফলে, ইসলামাবাদের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আগ্রহ দেখাচ্ছে রিয়াদ। আদিল সুলতানের এই বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আমির হুসাইন।

জেএফ-১৭ কেনো এতোটা আকর্ষণীয়?

বিশ্বের বিভিন্ন রণক্ষেত্র দাপিয়ে বেড়ানো জেএফ-১৭ কে বলা হয় মাল্টিরোল ফাইটার জেট। মানে স্থল ও আকাশে লক্ষ্যবস্তুতে সমানভাবে হামলা চালাতে পারে এটি। শুধু তাই নয়, প্রতিরক্ষা ও নজদারিতে এটির বেশ সুনাম রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন-ফ্রান্স ও কানাডাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অত্যাধুনিক একেকটি যুদ্ধবিমান কিনতে যেখানে গড়ে খরচ হয় ৮০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ডলার। সেখানে এই অর্থে কাছাকাছি সক্ষমতার জেএফ-১৭ সিরিজের যুদ্ধবিমান কেনা যায় অন্তত ৩-৪টি। বিশ্লেষকরা বলছেন— দাম কম, নাকি বেশি যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে সেটি মুখ্য বিষয় নয়।

কাগজে-কলমে যতই উন্নত প্রযুক্তির কথা বলা হোক না কেন, বাস্তব যুদ্ধে সক্ষমতার প্রমাণ না পাওয়া গেলে সেই যুদ্ধবিমান কেউ কিনতে চাইবে না। এখানে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—তাদের তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত বা ব্যাটল-টেস্টেড। ফলে, বিভিন্ন দেশ এই সমরাস্ত্রকে তাদের সমরভাণ্ডারে যুক্ত করতে চাইছে।

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত। বিমানের ৪২ শতাংশ চীনে এবং ৫৮ শতাংশ নির্মিত হয় পাকিস্তানে।

আল জাজিরা জানায়—বিশ্বের কতটি দেশের সাথে এই যুদ্ধবিমান বিক্রির আলোচনা চলছে, তা জানতে চেয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগ-আইএসপিআরকে প্রশ্ন পাঠিয়েছে তারা। কিন্তু আইএসপিআরের পক্ষ থেকে কোনো রেসপন্স করা হয়নি।

পাকিস্তান কী কী অস্ত্র রপ্তানি করে?

করাচিভিত্তিক ব্রোকারেজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেট্রেডের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে— কেবল যুদ্ধবিমানই নয়, ট্যাংক, ড্রোন, আর্মার্ড ভেহিকেল, নেভাল সিস্টেম এবং বিভিন্ন ছোট আগ্নেয়াস্ত্রও রপ্তানি করে করছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেটা বলছে— ২০২২ থেকে ২০২৩ অর্থবছরে পাকিস্তানের অস্ত্র রপ্তানির পরিমাণ লাফিয়ে বেড়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৩ মিলয়ন ডলার থেকে অস্ত্র রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, গোপনে ইউক্রেনে অস্ত্র রপ্তানির কারণে এই উল্লম্ফন। যদিও বরবরই ইউক্রেনে অস্ত্র রপ্তানির কথা অস্বীকার করে আসছে ইসলামাবাদ।

যদিও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চলতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। তবে, দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি বলেছেন, অস্ত্র রপ্তানি এই ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে দেবে। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তান যেভাবে অস্ত্র রপ্তানির অর্ডার পাচ্ছে, আগামী ৬ মাসের মধ্যে হয়তো আর ঋণ নিয়ে চলতে হবে না ইসলামাবাদকে।

তবে, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ জানিয়েছে—পাকিস্তান এখনো বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। দেশটির সিংহভাগ অস্ত্রই আমদানি করা হয় চীন থেকে। তবে, তারা কিছু অস্ত্র রপ্তানিও করে। আর সেটা বার্ষিক ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X