রবিবার
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিক্ষোভে উত্তাল জার্মানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

জার্মানির রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানিকে (এএফডি) ঘিরে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর দলটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছেন দেশটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একই সঙ্গে এএফডিকে নিষিদ্ধ করার দাবিও জোরালো হয়েছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বার্লিন, হামবুর্গ ও মিউনিখসহ জার্মানির প্রায় ২০টি শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এএফডিবিরোধী প্রচারগোষ্ঠী প্রুফ এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। আয়োজকদের দাবি, সব মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে এএফডিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। কোথাও লেখা ছিল ‘এএফডিকে এখনই নিষিদ্ধ করো’, আবার কোথাও বলা হয়, গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই।

আরেকটি প্রচারগোষ্ঠী ক্যাম্প্যাক্টের প্রধান ক্রিস্টোফ বাউটজ বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সংবিধানবিরোধী শক্তির উত্থান ঠেকাতেই সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।

ক্যাম্প্যাক্টের হিসাবে, হামবুর্গের কর্মসূচিতে প্রায় ২৫ হাজার এবং মিউনিখে ১২ হাজার মানুষ অংশ নেন। পুলিশও বার্লিনে একাধিক পৃথক বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতির কথা জানিয়েছে।

এএফডিবিরোধী এই বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে স্যাক্সনি-আনহাল্টের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল। ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এএফডি প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে জার্মানির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পেয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ ভোট।

অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ নীতির জন্য পরিচিত এএফডি সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। রাজ্য পার্লামেন্টের ৮৩টি আসনের মধ্যে দলটি ৩৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন আরও তিনটি আসন।

ফলে এককভাবে সরকার গঠনের পরিবর্তে এখন অন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থন বা জোটের প্রয়োজন হবে এএফডির।

নির্বাচনে বড় জয় পেলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ নয় এএফডির জন্য। জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখন পর্যন্ত দলটির সঙ্গে সরকার গঠনে রাজি হয়নি।

‘ফায়ারওয়াল’ নামে পরিচিত এই রাজনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই এএফডিকে ক্ষমতার বাইরে রাখা হচ্ছে। রাজ্য কিংবা জাতীয়—কোনো পর্যায়েই এখন পর্যন্ত এএফডি কোনো সরকারের অংশীদার হতে পারেনি।

তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দলটির অবস্থানেও কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এএফডির রাজ্য নেতা উলরিশ জিগমুন্ড ফলাফলকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, ভোটাররা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এবং সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব এএফডির হাতেই দেখতে চান।

এর আগে এককভাবে সরকার গঠনের কথা বললেও নির্বাচনের পর জিগমুন্ড অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এএফডির বিরুদ্ধে যখন বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলছে, তখন বার্লিনে পাল্টা সমাবেশ করেছে দলটি। সেখানে আসন্ন আঞ্চলিক নির্বাচনে দলটির প্রধান প্রার্থী ক্রিস্টিন ব্রিঙ্কারও অংশ নেন।

ফলে নির্বাচনী সাফল্যের পর এএফডিকে ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে, অন্যদিকে এর বিরোধিতায় রাজপথে বড় জমায়েত হচ্ছে।

জার্মানির ইতিহাসের কারণে এএফডির উত্থান নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে বিশেষ ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি শাসনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চরম ডানপন্থার বিষয়ে গভীর সতর্কতা তৈরি করেছে।

এর মধ্যেই একটি রাজ্যে এএফডির এত বড় ভোট পাওয়া দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিরোধীদের একটি অংশ এখন দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছে।

তবে জার্মানিতে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার আইনি প্রক্রিয়া বেশ কঠিন। এ কারণে এএফডিকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী নন।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, নির্বাচনী সাফল্যের পর এএফডি কি শেষ পর্যন্ত কোনো জোটের মাধ্যমে রাজ্য সরকারে প্রবেশ করতে পারবে, নাকি জার্মানির দীর্ঘদিনের ‘ফায়ারওয়াল’ নীতি তাদের ক্ষমতার বাইরে রেখেই দেবে। সেই উত্তর শুধু স্যাক্সনি-আনহাল্ট নয়, জার্মানির সামগ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank