মঙ্গলবার
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে জেন-জি ধাক্কা খেলেও নেপালে সফল হলো কীভাবে 

বিবিসি
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

জেন-জি’দের তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের কেপি শর্মা ওলির সরকারের পতন ঘটে। এরপর গত মাসে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালেন্দ্র শাহের শপথ গ্রহণ। নেপালে তরুণ আইনপ্রণেতাদের সংসদে প্রবেশের দৃশ্যটি দূর থেকে দেখে এক ধরনের আক্ষেপ বোধ করছিলেন বাংলাদেশি অ্যাক্টিভিস্ট উমামা ফাতেমা।

২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজপথে নামা হাজার হাজার 'জেন-জি' বিক্ষোভকারীদের একজন ছিলেন ফাতেমা। নেপালের আন্দোলনকারীদের মতো তারাও এক বিস্ফোরক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের তরুণ আন্দোলন এখনও কোনো অর্থবহ রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আন্দোলন পরবর্তী প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের বিপ্লব থেকে গড়ে ওঠা নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি'র (এনসিপি) ফলাফল হয়েছে অত্যন্ত হতাশাজনক। এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে নেপালে। সেখানে আন্দোলনের মাত্র ছয় মাস পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চার বছরের পুরনো দল 'রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি' (আরএসপি) ভূমিধস জয় পেয়েছে। এই বিজয় অসংখ্য জেন-জি রাজনীতিবিদকে সংসদে পাঠিয়েছে এবং আরএসপির সঙ্গে জোট করা সাবেক র‍্যাপার বালেন্দ্র শাহকে নেপালের নেতৃত্বে বসিয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেন-জি প্রজন্মের অসংখ্য প্রতিবাদী আন্দোলন দেখা গেলেও নেপালের মতো তরুণ বিক্ষোভকারীদের এভাবে ক্ষমতায় আসার নজির বিরল।

উমামা ফাতেমা বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি হতাশ হয়েছি। নেপালি তরুণরা যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করেছে তা দেখে আমাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আমার আফসোস হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি... এটা ভাবতেই খারাপ লাগে যে আমরা একই পদ্ধতিতে আমাদের দেশকে পুনর্গঠন করতে পারিনি।’

নেপালি তরুণ নেতারা তাদের এই বিজয়ের পেছনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে পারার ক্ষমতাকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। আরএসপির প্রার্থী হিসেবে কাইলালি জেলা থেকে বিজয়ী হওয়া কেপি খানাল বলেন, জেন-জি বিক্ষোভগুলো ‘দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগাতে পেরেছিল। একই সঙ্গে জেন-জিদের ত্যাগ এবং কণ্ঠস্বর সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল—তারা সেটি ভুলে যাননি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ধারাবাহিকতাও একটি বড় কারণ ছিল। আমরা জবাবদিহিতা ও বিচারের দাবিতে বারবার সোচ্চার হয়েছিলাম এবং ধীরে ধীরে সেই বার্তাটি সর্বত্র পৌঁছে গিয়েছিল। এটি কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং এটি একটি প্রকৃত এবং বিশ্বাসযোগ্য আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল যাতে মানুষ বিশ্বাস করত এবং অংশ নিতে চাইত।’

তবে বিশ্লেষকরা নেপালের অনন্য রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং তরুণদের চতুর সিদ্ধান্তকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থা জোট সরকারকে সুবিধা দেয়, ফলে সেখানে কোনো একক দল বছরের পর বছর আধিপত্য করতে পারেনি। গত ১৭ বছরে দেশটিতে ১৪টি সরকার এসেছে। রাজনীতির এই অস্থিতিশীলতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ মূলত প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ওপর ছিল, যার ফলে আরএসপি-র মতো নতুনেরা মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনিস্টারের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেমোক্রেসি’র পরিচালক নাতাশা কাউল বলেন, ‘নেপালের ক্ষেত্রে যেহেতু তিনটি প্রতিষ্ঠিত দলের কেউই একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি, তাই এর প্রধান সুফলভোগী হয়েছে আরএসপি এবং এর নেতা।’

বালেন্দ্র শাহ এবং আরএসপির জোট এবং অনেক তরুণ সক্রিয়বাদীর এই দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নির্বাচনী প্রচারণাকে শক্তিশালী করেছিল বলেও জানান তিনি।

নেপালি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমিষ মুলমি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে দলীয় সংগঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি যুব-নেতৃত্বাধীন দলকে নির্বাচনী সাফল্য পেতে হলে আগে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করতে হয়।’

ঠিক এই কারণেই তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদব গত বছর নতুন কোনো দল গড়ার বদলে আরএসপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘নির্বাচনে জয়লাভ করা কোনো তামাশা নয়। আন্দোলন সংগঠিত করা আর নির্বাচনে জয়ী হওয়া দুটি ভিন্ন বিষয়। একটি রাজনৈতিক দল হুট করে আকাশ থেকে পড়ে তৈরি হতে পারে না... এর জন্য বড় মেকানিজম প্রয়োজন।’

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর অভাব ছিল। জেন-জি আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এর ফলে অন্য দলগুলো (বিএনপি ও জামায়াত) মানুষের কাছে 'ভুক্তভোগী' হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং তারা সহজেই 'শাসকগোষ্ঠী বিরোধী' জনমতের সুফল ভোগ করেছে।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ইমরান আহমেদ বলেন, এই প্রতিষ্ঠিত দলগুলো সংস্কারের কথা বলে আন্দোলনের শক্তিকে নতুন সংগঠনগুলোর চেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে। বিশেষ করে এনসিপির বিতর্কিত ও রক্ষণশীল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তটি তাদের জন্য বিপর্যয়কর প্রমাণিত হয়েছে, যা তরুণ সমর্থকদের—বিশেষ করে নারীদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এনসিপি ৩০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৬টিতে জয়ী হয়।

দিল্লির এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ঋষি গুপ্ত বলেন, ‘একটি রক্ষণশীল শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে এনসিপি মূলত জেন-জির উদ্দেশ্যের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছিল।’

এছাড়া আন্দোলনের পর থেকে নির্বাচনের মধ্যকার দেড় বছরের দীর্ঘ বিরতিও তরুণদের উদ্দীপনা কমিয়ে দিয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশের বিক্ষোভকারীরা সরাসরি ক্ষমতায় যেতে না পারলেও তারা একটি বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন। ইমরান আহমেদ মনে করেন, এই আন্দোলন 'জাতীয় ডিসকোর্স' বা আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এর ফলেই একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে দেশের মানুষ সংবিধান ও বিচার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

নতুন বিএনপি সরকার ৩১ দফার সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও অনেকেই এতে সন্তুষ্ট নন। উমামা ফাতেমা বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই তারা আওয়ামী লীগের সেই প্রথাগত ধারাই অনুসরণ করছে।’

তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত তরুণদের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সুযোগের ওপর বেশি জোর দেওয়া।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বর্তমানে এক ধরনের মোহভঙ্গ হয়েছে এবং অনেকেই ভালো সুযোগের আশায় দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন। ফাতেমা বলেন, ‘তরুণদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে... এমনকি যারা আগে দেশে থাকার কথা ভাবত, তারাও এখন আর তেমনটা ভাবছে না।’

তবে কেউ কেউ এখনও আশাবাদী যে এনসিপি স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে লড়াই করে নিজেদের ভাবমূর্তি উদ্ধার করবে। এনসিপি নেতা রাহাত হোসেন বলেন, ‘যদি এনসিপি রাজপথে সাধারণ মানুষের সাথে লড়াই চালিয়ে যায় এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, তবে ভবিষ্যতে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।’

নেপাল ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের তরুণদের লক্ষ্য এখন একটাই, তারা পরিবর্তনের লড়াই থেকে পিছপা হবে না। নেপালের নতুন জেন-জি আইনপ্রণেতারা বলছেন, ‘আমরা রাজপথ থেকে সংসদে আসছি—আমাদের জায়গা বদলেছে কিন্তু লক্ষ্য নয়।’

অন্যদিকে বাংলাদেশের রাহাত হোসেন সতর্ক করে বলেন, যদি নতুন সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে তবে তারা আবারও রাজপথে নামবেন।

উমামা ফাতেমা মনে করেন, এবারের আন্দোলন হয়তো ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু পরবর্তী ধাপের আন্দোলন আরও জোরালো হবে। তার ভাষায়, আমাদের চেয়ে ১০ বছরের ছোট যারা, তারা একদিন ঠিকই তাদের নিজস্ব আন্দোলন গড়ে তুলবে। বাংলাদেশের পরবর্তী আন্দোলন সম্ভবত পরিচালিত হবে 'জেনারেশন আলফা'র হাত ধরে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন