মঙ্গলবার
১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
লোয়ি ইনস্টিটিউট

হাসিনার বক্তব্য দিল্লির ‘মাথাব্যথার’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে

এনপিবিনিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
expand
ছবি : সংগৃহীত

হাসিনা দীর্ঘদিন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হলেও সম্প্রতি তার বক্তব্য ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে দিল্লির ‘মাথাব্যথার’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে আশ্রয় দেয়া অব্যাহত রাখলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের টানাপড়েন আরো গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চীনের আরো কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক স্বাধীন আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান (থিংক ট্যাংক) লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

লোয়ি ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত বিশ্লেষণটি লিখেছেন অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ নীতি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক গ্রেস করকোরান। তার মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে ঘোষণা দিয়ে আসছেন এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ভারতের জন্যও তা ব্যাপক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

লোয়ি ইনস্টিটিউটের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়ে হাসিনা বড় ধরনের ঝুঁকিও নিয়েছেন। কারণ ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সহিংসভাবে দমনের ঘটনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। জাতিসংঘের এক তদন্তে বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান।

বিশ্লেষণে বলা হয়, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দলে থাকা দলটি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার অভিযোগে একাধিক ভোট বর্জন করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে নতুন সরকারকে গুরুতর অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ভারতের জন্য হাসিনার ঘোষণার সময়টিও বিশেষভাবে অস্বস্তিকর। শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো। তার দল আওয়ামী লীগও (কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত) নয়াদিল্লির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, বিশেষ করে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে। কিন্তু ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক তীব্রভাবে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তুলনামূলক স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছিল। একই সময়ে বাংলাদেশের জনপরিসরে ভারতবিরোধী মনোভাব আরো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দিল্লি। এর অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত।

বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু নয়াদিল্লি এখন পর্যন্ত তাতে সাড়া দেয়নি। ফলে ভারতে হাসিনার অবস্থান দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের মধ্যে চলমান উত্তেজনার অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে রয়েছে। তার সর্বশেষ বক্তব্য এ উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়েছে। নয়াদিল্লিতে হাসিনাকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার। অন্যদিকে ভারতের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ব্যক্তিগতভাবে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশজুড়ে বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ে।

লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন নতুন করে বিন্যস্ত হচ্ছে, তখন চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে চীনকে বেছে নেন তারেক রহমান। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সহায়তা চাইতে জুনে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের জন্যও এটি নতুন পরীক্ষা। নয়াদিল্লির সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত। হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া অব্যাহত রাখলে ভারত সাবেক এক মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু এতে তারেক রহমানের সরকারের অবিশ্বাস আরো গভীর হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকে চীনের আরো কাছে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

বিশ্লেষণটির উপসংহারে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন কিনা, তার চেয়ে ভারতে তার উপস্থিতি কী অর্থ বহন করছে—তার ওপরই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বেশি নির্ভর করতে পারে। তার উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের অমীমাংসিত উত্তরাধিকার এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank