বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যেভাবে কুখ্যাত যৌন অপরাধী হয়ে উঠলেন জেফ্রি এপস্টেইন

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২৬ পিএম
জেফরি এপস্টেইন
expand
জেফরি এপস্টেইন

‘আমি যৌন শিকারি নই, তবে আমি একজন অপরাধী’-জেফ্রি এপস্টেইনের উত্থান, অপরাধ ও অমীমাংসিত কেলেঙ্কারি

“আমি কোনও যৌন শিকারি নই, তবে আমি একজন অপরাধী। একজন খুনির সঙ্গে যে রুটি চুরি করে, তাদের মধ্যে যতটুকু পার্থক্য—ঠিক তেমন।”

২০১১ সালে নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এভাবেই নিজেকে বর্ণনা করেছিলেন কুখ্যাত মার্কিন অর্থকোটিপতি জেফ্রি এপস্টেইন।

২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি উচ্চ-নিরাপত্তা কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। সে সময় তিনি জামিনবিহীন অবস্থায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারের গুরুতর অভিযোগে বিচার শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন।

এর এক দশক আগেই অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এপস্টেইন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাকে আজীবনের জন্য ‘লেভেল থ্রি’ যৌন অপরাধী হিসেবে নথিভুক্ত করে—যার অর্থ, পুনরায় অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

শিক্ষক থেকে ওয়াল স্ট্রিটের ক্ষমতাবান

নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকে শহরের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। এক শিক্ষার্থীর প্রভাবশালী বাবার সুবাদে তিনি বিনিয়োগ ব্যাংক বেয়ার স্টার্নসে চাকরি পান এবং মাত্র চার বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার হন।

১৯৮২ সালে তিনি নিজস্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো’ প্রতিষ্ঠা করেন। এক সময় এই প্রতিষ্ঠান এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করত। অল্প সময়েই তিনি নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বাড়ি, ফ্লোরিডার প্রাসাদসম বাড়ি ও নিউ মেক্সিকোর বিশাল র‍্যাঞ্চের মালিক হন।

এর সঙ্গে গড়ে ওঠে রাজনীতিক, সেলিব্রিটি ও শিল্পপতিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

ট্রাম্প, ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু

২০০২ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন,
“আমি জেফকে ১৫ বছর ধরে চিনি। দারুণ মানুষ। সে আমার মতোই সুন্দরী নারীদের পছন্দ করে—অনেকেই আবার কম বয়সী।”

পরে ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রেপ্তারের বহু আগেই তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। হোয়াইট হাউস জানায়, কর্মচারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের কারণে তাকে ট্রাম্পের ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠদের তালিকায় ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, অভিনেতা কেভিন স্পেসি, ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং রাজনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসন। যদিও এসব সম্পর্ক থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ মেলে না।

তবে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক সবচেয়ে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। ২০১০ সালে নিউইয়র্কে তাদের একসঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশ পায়। পরে এপস্টেইনের অভিযোগকারী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে দাবি করেন, ১৭ বছর বয়সে তাকে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছিল। অ্যান্ড্রু অভিযোগ অস্বীকার করলেও ২০২২ সালে মামলার নিষ্পত্তিতে মোটা অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করেন। পরবর্তী সময়ে তার রাজকীয় উপাধিও প্রত্যাহার করা হয়।

ভয়াবহ অভিযোগ ও ‘শতাব্দীর সমঝোতা’

২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় এক ১৪ বছর বয়সী মেয়ের পরিবার প্রথম পুলিশের কাছে অভিযোগ করে। তদন্তে এপস্টেইনের বাড়ি থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের অসংখ্য ছবি উদ্ধার হয়।

মিয়ামি হেরাল্ড জানায়, পুলিশের কাছে অন্তত ৫০ জন ভুক্তভোগী একই ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তবু ২০০৮ সালে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের সঙ্গে এক বিতর্কিত সমঝোতার মাধ্যমে এপস্টেইন যাবজ্জীবন সাজা এড়িয়ে যান।

এই চুক্তির আওতায় তিনি মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড পান, তাও বিশেষ সুবিধাসহ—সপ্তাহে ছয় দিন ১২ ঘণ্টা অফিসে যাওয়ার অনুমতি ছিল তার। ১৩ মাস পর মুক্তি পান প্রবেশনে।

পরে জানা যায়, এই সমঝোতা অন্যান্য সম্ভাব্য অভিযুক্তদের তদন্ত কার্যত বন্ধ করে দেয়। এ কারণেই এটিকে “শতাব্দীর সমঝোতা” বলা হয়। এর জেরে ২০১৯ সালে তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী ও সাবেক প্রসিকিউটর আলেক্সান্ডার অ্যাকোস্টা পদত্যাগ করেন।

দ্বিতীয় গ্রেপ্তার ও রহস্যময় মৃত্যু

২০১৯ সালের জুলাইয়ে প্যারিস থেকে নিউইয়র্কে ফেরার পর এপস্টেইন আবার গ্রেপ্তার হন। প্রসিকিউটররা তার নিউইয়র্কের প্রাসাদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেন।

কারাগারে থাকার সময় একাধিকবার তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ১০ আগস্ট তিনি কারাগারেই মারা যান। সরকারি ভাষ্যে এটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও নিরাপত্তা ত্রুটি ও অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।

ম্যাক্সওয়েল অধ্যায়

এপস্টেইনের মৃত্যুর পর গ্রেপ্তার হন তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল। ২০২১ সালে তিনি যৌন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০ বছরের কারাদণ্ড পান।

আদালত রায়ে বলে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের এপস্টেইনের কাছে এনে শোষণে সহায়তা করেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। সাজা ঘোষণার সময় তিনি বলেন, জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচয় হওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

আইনি অধ্যায় অনেকটাই শেষ হলেও এপস্টেইন কেলেঙ্কারির ছায়া এখনো বিশ্ব রাজনীতি ও ক্ষমতার অলিন্দে ভাসছে—অপ্রকাশিত নথি, চাপা পড়া নাম আর অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে।

সূত্র: বিবিসি

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X