

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১৩ জানুয়ারি পেন্টাগনকে ইরানে হামলার প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তবে শেষ মুহূর্তে অপারেশনের প্রতিকূল সময়ের কথা বিবেচনা করে এবং পরামর্শদাতাদের আপত্তিতে তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্ভব নয়।
এছাড়া উপদেষ্টারা যুক্তি দেখান যে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সৈন্য ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত নেই।
সূত্রগুলো ডব্লিউএসজে-কে জানিয়েছে, আরব দেশগুলো ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট করে দেয় যে এই সময়ে হামলার ফলাফল হিতে বিপরীত হতে পারে।
তাদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থাকলেও বিক্ষোভগুলো মূলত দমন করা হয়েছে এবং শাসন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট বিরোধী নেতৃত্ব নেই।
এছাড়া আরব কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন যে, হামলা হলে ইরান কাতার, সউদী আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
নেতানিয়াহু জানান, ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা মোকাবিলায় ইসরাইলের আরও বেশি মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হবে।
এসব বহুমুখী চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। তবে ১৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, তাকে কেউ সিদ্ধান্ত বদলাতে প্ররোচিত করেনি, বরং তিনি নিজেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ ৮০০ জনেরও বেশি মানুষের ফাঁসি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত বাতিল করায় সেটি তার ওপর ‘বড় প্রভাব’ ফেলেছে। তবে ইরানে হামলা না করার এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি।
বিক্ষোভে প্রাণহানির যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের : ইরানে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণবিক্ষোভ নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন ভাষণে পরিস্থিতির বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
তিনি স্বীকার করেন, গত কয়েক সপ্তাহের সহিংসতায় বহু ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এই সংকটের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ উসকানি ও হস্তক্ষেপ বড় ভূমিকা রেখেছে।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলেছে। মূলত অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ দেখা দেয়।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ভাষণে খামেনেই বলেন, এই বৈধ অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে কিছু সংগঠিত গোষ্ঠী সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। তার দাবি, ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রতিবাদকারীদের উৎসাহ দেন এবং সামরিক সহায়তার ইঙ্গিত দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করেন।
এজন্য তিনি ট্রাম্পকে এই প্রাণহানির জন্য দায়ী করেন। খামেনি জানান, প্রতিবাদকারীদের একাংশ বিদেশি সমর্থন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল, আরেক অংশ বিভ্রান্ত হয়ে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, সহিংস গোষ্ঠীগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালায়। সরকার এটিকে পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে দেখছে।
ইরানের মানবাধিকার কর্মীদের সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ তিন হাজারের বেশি মৃত্যুর দাবি করলেও সরকার এই সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত ও যাচাইবিহীন বলে মনে করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক এবং হাজার হাজার মৃত্যুর কথা ভুল তথ্য ছড়ানোর অংশ।
খামেনেই বলেন, এই ঘটনার জন্য আমেরিকাকে জবাবদিহি করতে হবে।” সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করে, যা পরে ধীরে ধীরে পুনরায় চালু করা হয়।
খামেনি স্পষ্ট করেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, বিচার হবে আইন অনুযায়ী, কোনো বিশৃঙ্খল প্রতিশোধ নয়।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি স্বীকার করেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কঠিন। তবে তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, ইসলামিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তাদের জরুরি পণ্য সরবরাহ জোরদার করার নির্দেশ দেন তিনি।
সাম্প্রতিক প্রো-সরকারি সমাবেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। ইরানের এই সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েনের সঙ্গেও জড়িত বলে তেহরানের দাবি।
সরকার বলছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক সংস্কার ও জনগণের বাস্তব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই লক্ষ্যেই ইরান এখন স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের পথে এগোতে চায়।
বন্দরের বাইরে অপেক্ষায় অসংখ্য বাণিজ্যিক জাহাজ : ইরানের বন্দরের কাছাকাছি সমুদ্রে অসংখ্য বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর ফেলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অঞ্চলটি বিশ্বের তেল বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং যেকোনো সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
রয়টার্সের ১৩ জানুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরানের বন্দরের বাইরে ডজনখানেক বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর করেছে।
জাহাজ মালিকরা এটিকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন, কারণ বন্দরের ভিতরে থাকলে যুদ্ধবিমান হামলায় অবকাঠামোর ক্ষতির সঙ্গে জাহাজগুলোও বিপদে পড়তে পারে। গালফ কারেন্টস নিউজলেটারের প্রতিবেদনে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, শক্তি ও অর্থনীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কিছু সেনাসদস্য ও কর্মী সরিয়ে নিচ্ছে। একই সময়ে ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়, তারা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম।
ইরান তার আমদানির জন্য শুষ্ক ছড়িয়ে বহনকারী জাহাজ, সাধারণ কার্গো জাহাজ ও কনটেইনার জাহাজের ওপর নির্ভর করছে। রপ্তানির জন্য তেলের ট্যাঙ্কার ব্যবহার করা হচ্ছে।
মার্সাইম ইন্টেলিজেন্স সল্যুশন প্রোভাইডার পোল স্টার গ্লোবালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬ জানুয়ারি থেকে ১২ জানুয়ারির মধ্যে ইরানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইইজেড) তেলের ট্যাঙ্কারের সংখ্যা ১টি থেকে বেড়ে ৩৬টিতে পৌঁছেছে। এই এলাকা ফারাসি উপসাগর এবং ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী ২৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত।
মেরিনট্র্যাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ইমাম খোমেনি বন্দরের কাছে অন্তত ২৫টি শুষ্ক ছড়িয়ে বহনকারী জাহাজ স্থির রয়েছে। দক্ষিণে বন্দর আব্বাসের কাছে আরও ২৫টি জাহাজ, যার মধ্যে কনটেইনার ও কার্গো জাহাজ রয়েছে, নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল বন্দর আব্বাসে হামলা চালিয়েছিল, যেখানে এপ্রিল মাসে অজানা বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছিল। সূত্র : আল-জাজিরা, সিএনএন, রয়টার্স।
মন্তব্য করুন