সোমবার
২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পেনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো যেভাবে

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ পিএম
স্পেন। ছবি: ইন্টারনেট
expand
স্পেন। ছবি: ইন্টারনেট

সময়টা ৭১১ খ্রিস্টাব্দ। স্পেনের নাম ছিলে হিস্পানিয়া। ভিসিগোথ (Visigoth) রাজাদের শাসনাধীন। তৎকালীন রাজা রডারিক অত্যন্ত অত্যাচারী। তার প্রজারা, বিশেষ করে ইহুদি এবং সাধারণ খ্রিস্টানরা তীব্র অসন্তুষ্ট তার উপর। তার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে কাউন্ট জুলিয়ান নামের এক স্থানীয় শাসক রডারিকের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

প্রতিশোধ নেওয়ার তাগিদে তিনি সমুদ্র পেরিয়ে ছুটে আসেন উত্তর আফ্রিকার মুসলিম গভর্নর মুসা বিন নুসাইর-এর কাছে। এসে অনুরোধ জানান স্পেন আক্রমণের। সেই সঙ্গে, জাহাজসহ আর্থিক সহযোগিতারও আশ্বাস দেন জুলিয়ান। মুসা ইবনে নুয়াইর তার আহ্বানে সাড়া দেন।

বারবার তরুণ তারিক ইবনে জিয়াদ তখন মুসা ইবনে নুয়াইয়ের সেনাপতি। মুসা সেনাপতি তারিককে নির্দেশ দেন স্পেনে হামলা চালানোর। তারিক দেরি না করে খুব অল্প সময়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তার সেনাসংখ্যা কম। মাত্র ৭,০০০। তবে প্রতিজন মনে আল্লাহর প্রতি অগাধ ভরসা আর আত্মবিশ্বাস। এর আগে তারা, তাদের জাতি ভাইয়েরা রোম-পারস্যের মতো পরাশক্তিগুলোকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে—স্পেন তো সে তুলনায় কিছুই না। তা সত্ত্বেও কোনো শত্রুকেই ছোট মনে করতে নেই, অবহেলায় এড়িয়ে যেতে নেই—এ কথা তাদের ভালো করেই জানা। তাই আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস আর ভরসা নিয়ে চালিয়ে যায় পূর্ণ প্রস্তুতি।

প্রস্তুতি শেষে, বীরদর্পে এগিয়ে যায় মুসলিম বাহিনী। বিশাল সমুদ্র পারি দিয়ে তারা অবতরণ করেন একটি পাহাড়ের পাদশেষে। পরবর্তীতে সে পাহাড়ের নাম রাখা হয়—‘জাবাল আল-তারিক’ (তারিকের পাহাড়)। আজ আমাদের কাছে জিব্রাল্টার (Gibraltar) নামে পরিচিত।

স্পেনে নেমেই তারিক এক অভূতপূর্ব এক সিদ্ধান্ত নেন। সৈন্যদের সমস্ত জাহাজ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে, সবাইকে সম্বোধন করে দেন এক ঐতিহাসিক ভাষণ—‘আমার যোদ্ধারা, আমাদের সামনে শত্রুভূখণ্ড। পেছনে, বিশাল সমুদ্র। আল্লাহর কসম, পালানোর সমস্ত পথ আমাদের জন্য বন্ধ। এখন হয়তো বিশাল এই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে কাপুরুষের মৃত্যু গ্রহণ করতে হবে নতুবা শত্রুর সঙ্গে বীরদের মতো লড়তে হবে।’

সেনাপতি তারেক ইবনে জিয়াদের কর্মকাণ্ডে প্রথমে সেনাদের কিছুটা দুঃখবোধ হলেও, তার অগ্নিঝরা বক্তব্যে সবার রক্তে জ্বলে ওঠে চেতনার আগুন। ইতিহাসের পাতায় রচিত হয় এক রক্তক্ষয়ী তবে দিগ্বিজয়ের অধ্যায়।

৭১১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস। রাজা রডারিকের প্রায় এক লাখ বিশাল বাহিনী নিয়ে তারিক ইবনে জিয়াদের ছোট্ট বাহিনীর মুখোমুখি। এই ছোট বাহিনীকে মুহূর্তেই নস্যাৎ করা যাবে ভেবেছিল রাজা রডারিক। কিন্তু শুরু হতেই মুসলিম বাহিনীর রণকৌশলের কাছে ধসে যায় তার অহংকারের প্রাসাদ। সে যুদ্ধেই এই অত্যাচারী রাজার নির্মম মৃত্যু হয়। তবে তার মৃত্যু ঠিক কীভাবে, কার হাতে হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিহাসে আছে নানান গল্পকথা ও মতভেদ।

ভিসিগোথ রাজা রডরিকের পরাজয়ে স্পেনে বয়ে যায় খুশির হিল্লোল। দীর্ঘ শোষণ থেকে মুক্তি পেয়ে স্পেনের জনসাধারণ মুসলিম বাহিনীকে বুকে জড়িয়ে নেয়, স্বাগত জানায় নিজেদের মাতৃভূমিতে। প্রাণপনে তারা বরণ করে নেয় ইসলামি শাসনব্যবস্থা।

রডারিকের মৃত্যু, জনসাধারণের আন্তরিকতায় খুব সহজেই স্পেনের রাজধানী কর্ডোভা চলে আসে মুসলিমদের হাতে।

এরপর সেখানে মুসলিমদের জয় আর ঠেকাতে পারেনি কোনো রাজা। বন্যার বানের মতো তাদের হাতে একের পর এক বিজিত হতে থাকে শহরের পর শহর। এভাবেই ইউরোপ মহাদেশের বুকে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলাম, মুসলিম শাসন। যার সুবাস ছড়াতে থাকে পরবর্তী ৮০০ বছর।

তথ্যসূত্র: মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, আন্দালুসের ইতিহাস, লেখক: ড. রাগিব সারজানি উইকিপিডিয়া, গ্রোকোপিডিয়া, বিটানিকা

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন