

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


অবশেষে অনেক নতুনের জয়গানে পর্দা নামল বিশ্বকাপের। বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়েছে কোটি সমর্থকের শিরোপা জয়ের স্বপ্নও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, বন্ধুদের খোঁচা আর প্রিয় দলের বিদায়ের হতাশায় অনেক সমর্থকই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তবে এমন অনুভূতি স্বাভাবিক হলেও তা যেন দৈনন্দিন জীবন বা সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। একই সঙ্গে নিজের পাশাপাশি প্রিয়জনের মানসিক অবস্থার প্রতিও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন।
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, অনেকের কাছে এটি আবেগ, স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ। বছরের পর বছর একটি দলকে সমর্থন করতে করতে তার জয়-পরাজয়ের সঙ্গে নিজের অনুভূতিও জড়িয়ে যায়। তাই বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রিয় দলের বিদায় অনেকের কাছেই কেবল একটি ম্যাচ হারার ঘটনা নয়, বরং যাওয়া প্রত্যাশার ভাঙনও।
প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। মন খারাপ লাগলে সেটিকে অস্বীকার না করে নিজেকে কিছুটা সময় দিন। মনে রাখুন, একটি ম্যাচের ফলাফল আপনার ব্যক্তিগত সাফল্য, আত্মসম্মান বা যোগ্যতার পরিচয় নয়। খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্য আনন্দ ও বিনোদন, তাই পরাজয়কে জীবনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, ব্যঙ্গচিত্র ও নানা ধরনের মন্তব্যের বন্যা শুরু হয়। এসব পোস্ট অনেক সময় হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রয়োজন হলে কয়েক ঘণ্টা বা এক দিনের জন্য ফেসবুক, এক্স কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকুন। বন্ধুদের মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নোটিফিকেশনও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারেন।
সব ট্রলের জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। অনেক সময় নীরব থাকা বা হেসে উড়িয়ে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া। আবেগের বশে কোনো মন্তব্য করলে তা পরে অনুশোচনার কারণ হতে পারে।
হতাশা কাটাতে হাঁটাহাঁটি, হালকা ব্যায়াম, বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পছন্দের কোনো খাবার খাওয়া বা এক কাপ চা-কফিও মনকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। একই সঙ্গে ম্যাচের হাইলাইট বা বিশ্লেষণ বারবার না দেখে অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিলে হতাশা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়।
তবে শুধু নিজের কথাই নয়, প্রিয় দলের হারে মন খারাপ করা কোনো বন্ধু, সহকর্মী বা পরিবারের সদস্যের প্রতিও সহমর্মী হওয়া উচিত। এমন দিনে ‘আগেই বলেছিলাম’, ‘তোমাদের দল তো শেষ’ কিংবা ‘এবার বুঝলে?’এ ধরনের মন্তব্য না করাই ভালো। এগুলো মুহূর্তের হাসির কারণ হলেও অন্যের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বরং এক কাপ চা বা কফির আড্ডায় তাকে সময় দিন। পছন্দের কোনো খাবার খেতে যেতে পারেন কিংবা এমন কোনো মজার ভিডিও বা হালকা মিম শেয়ার করতে পারেন, যা খোঁচা নয়, মুখে হাসি ফোটাবে। এ সময় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, স্পেন কিংবা অন্য কোনো তুলনামূলক বিতর্ক এড়িয়ে চলাই ভালো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন প্রকৃত সমর্থক শুধু জয়ের সময় নয়, পরাজয়ের দিনেও দলের পাশে থাকেন। একটি টুর্নামেন্টে বিদায় মানেই সব শেষ নয়। সামনে নতুন প্রতিযোগিতা, নতুন সুযোগ এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে।
একই সঙ্গে যারা ট্রল করেন, তাদেরও সংযত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। খেলাকে ঘিরে বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা-তামাশা থাকতেই পারে, তবে সেটি যেন কখনো ব্যক্তিগত অপমান, বিদ্বেষ বা কাউকে মানসিকভাবে আঘাত করার পর্যায়ে না পৌঁছায়। কারণ একটি মন্তব্য মুহূর্তের বিনোদন দিলেও তা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
ফুটবল জয়-পরাজয়ের বাইরেও আবেগ, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার গল্প বলে। তাই প্রিয় দলের হারে কষ্ট পাওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি সেই কঠিন সময়ে নিজেকে সামলে নেওয়া এবং প্রিয়জনের পাশে দাঁড়ানোই একজন পরিণত ক্রীড়াপ্রেমীর পরিচয়। কারণ স্কোরলাইন বদলে যায়, ট্রফিও হাতবদল হয়, কিন্তু মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়।