

ধন-সম্পদ মহান আল্লাহর নিয়ামত। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে সম্পদ অর্জন করতে হয়। কিছু ইবাদত ফরজ হওয়ার সঙ্গেও সম্পদের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সম্পদ অর্জনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। আবার সম্পদ অর্জন করা সব ক্ষেত্রে হারামও নয়। মহান আল্লাহর দেওয়া নিয়ম মেনে সম্পদ অর্জনে ইসলামের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উদ্দেশে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমার উত্তরাধিকারীদের মানুষের মুখাপেক্ষী বানিয়ে দারিদ্রবস্থায় রেখে যাওয়া অপেক্ষা স্বচ্ছলাবস্থায় রেখে যাওয়া অধিক উত্তম।’ (বুখারি, হাদিস : ১২৯৫)
তবে এও মনে রাখতে হবে, ধন-সম্পদ সবার জন্য শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়। অনেকে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বলে বসে, আমরা এত ইবাদত করি, দোয়া করি আমাদের ধন-সম্পদ হয় না কেন! (নাউজুবিল্লাহ!)
এ কথার উত্তর মহান আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি মনে করে আমি তাদেরকে যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে যাচ্ছি, তা দ্বারা তাদের কল্যাণ সাধনে ত্বরা দেখাচ্ছি? না, বরং প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তাদের কোনো অনুভূতিই নেই।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৫৫-৫৬)
এই আয়াতের তাফসিরে এসেছে, কাফেররা দাবি করত তারাই সঠিক পথে আছে আর তারা প্রমাণ হিসেবে বলত, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ধনে-জনে সম্পন্নতা দান করেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায় তিনি আমাদের প্রতি খুশী। ফলে আগামীতেও তিনি আমাদেরকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখবেন। তিনি নারাজ হলে এমন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আমাদেরকে দিতেন না। এটা প্রমাণ করে আমরাই সত্যের উপর আছি। এ আয়াতে তাদের সে দাবির জবাব দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, দুনিয়ায় অর্থ-সম্পদের প্রাপ্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি প্রমাণ করে না। কেননা তিনি কাফের ও নাফরমানকেও রিজিক দান করেন।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মূল মাপকাঠি হলো তাকওয়া। যাকে মহান আল্লাহ তাকওয়ার সম্পদ দিয়েছেন, সেই শ্রেষ্ঠ ধনী। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মুত্তাকী।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এর পাশাপাশি যারা আল্লাহর হুকুম মেনে হালাল ভাবে সম্পদ অর্জন করে এবং তা আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে ব্যয় করে, তাহলে তা মুমিনের আমলের পাল্লা ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই মহান আল্লাহর দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। হালাল পন্থায় সম্পদ অর্জন করতে হবে। সঠিকভাবে সম্পদের জাকাত আদায় করতে হবে। নইলে এই সম্পদই কঠিন বিপদের কারণ হতে পারে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উত্পন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬১)
তাই সম্পদ অর্জন ও তা খরচে খুব সতর্ক হতে হবে। একটু অসতর্কতা ও অবহেলার কারণে এই নিয়ামতই কখনো কখনো বিপদে পরিণত হতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের সঞ্চিত সম্পদ, যেগুলোর জাকাত আদায় করা হয়নি, কিয়ামতের দিন এগুলো টাকওয়ালা হিংস্র সাপে পরিণত হবে। সম্পদের মালিক তা থেকে পালাতে থাকবে। কিন্তু সাপ তার পেছনে লেগে থাকবে। আর বলবে, আমি তোমার সঞ্চিত সম্পদ। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! সাপ তার পিছু ধাওয়া করতেই থাকবে। পরিশেষে সে বাধ্য হয়ে তার হাত প্রসারিত করে দেবে। ফলে সাপ তার মুখ গিলে নেবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৯৫৭)
প্রশ্ন জাগতে পারে, উল্লিখিত হাদিসে সঞ্চিত সম্পদকে সাপের সঙ্গে তুলনা করা হলো কেন? স্বপ্নযোগে সাপ দেখলেও কোনো কোনো স্কলাররা এর ব্যাখ্যা সম্পদ অর্জন করেন কেন? এর উত্তর হলো, সাপ যেমন আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি প্রাণী। কিন্তু তা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন ও নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হয়।
বিশ্বে সাপের বিষের রয়েছে বড় বাজার। ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল ও নানা গবেষণার কাজে ব্যবহূত হচ্ছে এই বিষ বা ভেনম। সাপের মাংস ও চামড়াও বড় আয়ের উত্স। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বে বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ পাউন্ড সাপের বিষের চাহিদা রয়েছে। যেখানে এক গ্রাম বিষের দাম সাপ ভেদে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার আমেরিকান ডলার।
সাপের বিষ ঔষধ শিল্পের গুরুত্বপূর্ন কাঁচামাল। ক্যান্সারসহ বেশকিছু রোগের প্রতিষেধক তৈরি করতেও এর প্রয়োজন। গবেষনার কাজেও হয় ব্যবহার।
কাজেই মানুষের জীবন রক্ষাকারী ঔষধ তৈরি করতেও সাপের বিষ প্রয়োজন হয়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে বছরে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণ করে। (ডি ডব্লিউ ডটকম) এর কারণ হলো, সাপ কিংবা তার বিষ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি আছে। যারা তা অনুসরণ করে তারা তা থেকে উপকৃত হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত ঘটলেই বিপত্তি ঘটতে পারে। হতে পারে মৃত্যু। তদ্রুপ সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রেও হালাল পন্থায় তা অর্জন করতে হয়। প্রতি বছর সঠিকভাবে তার জাকাত আদায় করতে হয়। যদি কেউ এই নিয়মগুলো না মেনে সম্পদ অর্জন ও সঞ্চয় করতে যায়, তাহলে এই সম্পদই তার ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
তাই আমাদের উচিত, মহান আল্লাহর দেওয়া নির্দেশনা মেনে সম্পদ অর্জন করা, সঠিকভাবে জাকাত দেওয়া ও বেশি বেশি দান-সদকা করা। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।
মন্তব্য করুন